Bangladesh Cricket

লিটন দাসের ওডিআই গড় ও মিরপুরের উইকেট নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য | Litton Das on Mirpur Pitch

Rohit Verma · · 1 min read

মিরপুরের উইকেট ও লিটন দাসের আক্ষেপ: পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা

আধুনিক ক্রিকেটে একজন ব্যাটারের মানদণ্ড বিচার করা হয় তার ব্যাটিং গড় এবং স্ট্রাইক রেট দিয়ে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান কি সবসময় একজন ক্রিকেটারের প্রকৃত দক্ষতা ফুটিয়ে তুলতে পারে? বাংলাদেশের অন্যতম সেরা স্টাইলিশ ওপেনার লিটন কুমার দাস মনে করেন, পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা গল্প। বিশেষ করে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মতো কঠিন কন্ডিশনে বছরের পর বছর খেলে নিজের গড়কে উঁচুতে রাখা যে কোনো ব্যাটারের জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ।

লিটন দাস সম্প্রতি বিসিবির একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। সেখানে উঠে আসে তার ওডিআই ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান। বর্তমানে তার ওডিআই গড় ৩০-এর আশেপাশে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে এই গড়কে খুব একটা গর্ব করার মতো কিছু মনে করেন না লিটন নিজেই। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং মিরপুরের প্রতিকূল পরিবেশে এটিকে তিনি এক ভিন্ন নজরে দেখছেন।

ওডিআই ব্যাটিং গড় নিয়ে লিটনের অকপট স্বীকারোক্তি

লিটন দাসের মতে, ওডিআই ক্রিকেটে ৩০ গড় কোনোভাবেই একজন শীর্ষ সারির ব্যাটারের জন্য আদর্শ নয়। তিনি বলেন, “ওডিআইতে ৩০ গড় নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। বাংলাদেশের জন্য হয়তো এটি খুব খারাপ নয়, আবার আমি একে চমৎকারও বলব না। আমরা যে কন্ডিশনে বড় হয়েছি এবং যেখানে খেলেছি, তা বিবেচনায় নিলে এই গড়কে কিছুটা গ্রহণযোগ্য বলা যায়। আপনি হয়তো একে ৬০-৪০ হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু এই গড় নিয়ে যদি আমি অন্য কোনো দেশে খেলতাম, তবে অবশ্যই বলতাম এটা খুবই নিম্নমানের পারফরম্যান্স।”

লিটনের এই মন্তব্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, তিনি নিজের সামর্থ্য নিয়ে সচেতন এবং আরও ভালো করার ক্ষুধার্ত। তবে বাংলাদেশের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল ভেন্যু মিরপুরের উইকেটের প্রভাব তার পরিসংখ্যানে কতটা পড়েছে, তা তিনি বেশ জোরালোভাবেই তুলে ধরেছেন।

মিরপুরের উইকেট: ব্যাটারদের জন্য কেন যম?

দীর্ঘদিন ধরে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পিচ মন্থর এবং স্পিন-বান্ধব হিসেবে পরিচিত। এখানে বল নিচু হয়ে আসে এবং টার্ন করে অবিশ্বাস্যভাবে। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য মাঠে অনায়াসেই ৩৫০ বা ৪০০ রান উঠছে, সেখানে মিরপুরে ২৫০ রান তাড়া করাও হিমশিম খেতে হয় বিশ্বের বাঘা বাঘা দলগুলোকে। লিটন দাসের মতে, এই ধরনের উইকেটে ব্যাটিং করা কেবল কঠিনই নয়, বরং ব্যাটারদের পরিসংখ্যান নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমি যদি মিরপুরে এত বেশি ম্যাচ না খেলতাম, তবে আমার গড় এবং স্ট্রাইক রেট এতটা কম হতো না। সেখানে বোলিং করা খুব সহজ ছিল, কিন্তু ব্যাটিং ছিল চরম কঠিন। কখনও কখনও বোলাররা নিজেরাও জানত না বলটি পিচ করার পর কী করবে, তাহলে একজন ব্যাটার কীভাবে বুঝবে? বিশ্বের অনেক বিশ্বমানের ব্যাটার এখানে এসে খাবি খেয়েছে।”

পরিসংখ্যান কি সব কথা বলে?

ক্রিকেট ইতিহাসে এমন অনেক কিংবদন্তি আছেন যারা হয়তো রানের পাহাড়ে চড়েননি, কিন্তু কঠিন সময়ে দলের হাল ধরেছেন। লিটন মনে করেন, পরিসংখ্যান কখনও দেখায় না যে একজন ব্যাটার কোন ধরনের পিচে এবং পরিস্থিতিতে তার রানগুলো করেছে। মিরপুরের মন্থর উইকেটে প্রতিটি রান করতে যে সংগ্রাম করতে হয়, তা ফ্ল্যাট উইকেটে করা শত রানের চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে। আগে বাংলাদেশের জয়ের স্বার্থে এই ধরনের উইকেট তৈরি করা হতো, যেখানে প্রতিপক্ষকে স্পিন জালে আটকে ফেলা যেত। দল জিতলেও এর প্রভাব সরাসরি পড়ত ব্যাটারদের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে।

উইকেটের মানোন্নয়ন ও আগামীর স্বপ্ন

তবে লিটন আশাবাদী যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের উইকেটগুলোতে কিছুটা ঘাস এবং বাউন্স দেখা যাচ্ছে, যা ব্যাটারদের জন্য সহায়ক। লিটন বিশ্বাস করেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশের ব্যাটারদের গড় এবং স্ট্রাইক রেট দুই-ই বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, “উইকেটগুলো ইদানীং অনেক ভালো হয়েছে। যদি কন্ডিশন আগামী পাঁচ-ছয় বছর এরকম থাকে, তবে এটি অনেক সাহায্য করবে। আগে উইকেটগুলো একজন ব্যাটারের সংখ্যা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মানুষ তখন খুশি ছিল কারণ দল জিতছিল।”

নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য নিয়ে লিটন জানান, তিনি তার ওডিআই ক্যারিয়ারের শেষে ব্যাটিং গড় ৪০ থেকে ৪৫-এর মধ্যে দেখতে চান। এটি অর্জন করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, “আমি ওডিআই ক্যারিয়ার ৪০-৪৫ গড় নিয়ে শেষ করতে চাই। আমি জানি না কতদিন আমরা ভালো উইকেট পাব বা আমি কতদিন খেলব। আমি ইতোমধ্যে ১০০-র বেশি ম্যাচ খেলে ফেলেছি, যার বেশিরভাগই ছিল অত্যন্ত কঠিন পিচে যেখানে ২৪০ বা ২৫০ রানও চ্যালেঞ্জিং মনে হতো। এখন খেলোয়াড়রা ভালো ব্যাটিং উইকেট পাচ্ছে। এই ধরনের উইকেট চলতে থাকলে আমাদের ব্যাটিংয়ের চেহারা বদলে যাবে।”

টি-টোয়েন্টি বনাম ওডিআই: মানসিকতার পার্থক্য

বর্তমানে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা লিটন দাস মনে করেন, ফরম্যাট অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন বদলানো জরুরি। টি-টোয়েন্টিতে গড় বা স্ট্রাইক রেটের চেয়ে ‘ইমপ্যাক্ট’ বা প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু টেস্ট এবং ওডিআইতে একজন ব্যাটারকে অবশ্যই ভালো গড় বজায় রাখতে হয়। তিনি নিজেকে মূলত একজন ব্যাটার হিসেবেই দেখেন এবং উইকেটকিপিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে নিজের সেরাটা দিতে চান।

পরিশেষে, লিটন দাসের এই বক্তব্য বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির এক গভীর সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। শুধুমাত্র জয়ের নেশায় মন্থর উইকেট তৈরি করা যে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাস ও ক্যারিয়ারের ক্ষতি করতে পারে, তা এখন বিসিবিও বুঝতে শুরু করেছে। মিরপুরের মরণফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে স্পোর্টিং উইকেটে খেললে লিটন দাসের মতো প্রতিভাবান ব্যাটাররা তাদের ক্যারিয়ারকে আরও উজ্জ্বল উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন, এটাই ভক্তদের প্রত্যাশা।

Avatar photo
Rohit Verma

Rohit Verma delivers detailed match reports, score recaps, and post-game summaries from IPL and ICC events.