Mehidy confident of taking on Australia on green-tinged pitch – বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া ওডিআই
মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মূল উইকেট থেকে যখন কাভারটি সরিয়ে নেওয়া হলো, তখন দেখা গেল এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য। সাধারণত মিরপুরের পিচ মানেই যেখানে শুষ্ক ও স্পিন-সহায়ক মাটির সমারোহ, সেখানে এবার দেখা গেল সবুজ ঘাসের আস্তরণ। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার প্রথম ওয়ানডে ম্যাচের আগে এই সবুজ উইকেট ক্রিকেট ভক্ত ও বিশ্লেষকদের মনে ব্যাপক কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে। তবে এই সবুজ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশ শিবিরে কোনো ভীতি নেই, বরং অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ আত্মবিশ্বাসী। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, Mehidy confident of taking on Australia on green-tinged pitch অর্থাৎ সবুজ উইকেটেই অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণের মুখোমুখি হতে পুরোপুরি প্রস্তুত বাংলাদেশ।
মিরপুরের উইকেটে নতুন হাওয়া ও মিরাজের ভাবনা
বাংলাদেশ অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ঘরের মাঠে স্পিনারদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য মন্থর ও ভাঙা উইকেট তৈরির সনাতন কৌশল থেকে তারা এখন অনেকটাই সরে এসেছেন। বাংলাদেশ এখন এমন স্পোর্টিং উইকেটে খেলতে চায়, যেখানে ব্যাটাররা নিজেদের মেলে ধরে দীর্ঘমেয়াদী আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারেন। সম্প্রতি পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে ঐতিহাসিক জয়ের পর দলের মানসিকতায় এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ভালো উইকেটে খেলে ম্যাচ জিততে পারলে দলের সামগ্রিক আত্মবিশ্বাস অনেক উঁচুতে থাকে বলে মনে করেন অধিনায়ক।
মিরাজ বলেন, “অনেকেই মনে করেন মিরপুর মানেই কেবল স্পিন উইকেট বা অনুন্নত উইকেট, কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। গত দুই-তিনটি সিরিজে আমরা দেখেছি যে মিরপুরেও ভালো উইকেট তৈরি করা সম্ভব। আমরা ভালো উইকেটে খেলার চেষ্টা করব। কারণ আমরা যদি ভালো উইকেটে ম্যাচ জিততে পারি, বোলাররা যদি ভালো জায়গায় বল করতে পারে এবং ব্যাটাররা রান পায়, তবে দিনশেষে দলের আত্মবিশ্বাস অনেক বৃদ্ধি পাবে। সামনে আমাদের বড় টুর্নামেন্ট (ওডিআই বিশ্বকাপ) রয়েছে, তাই এখন ভালো উইকেটে খেলে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারলে তা দলের জন্য দারুণ সহায়ক হবে।”
অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তুতি ও জশ ইংলিশের পর্যবেক্ষণ
এদিকে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক জশ ইংলিশ জানিয়েছেন, তারা এই সিরিজের প্রস্তুতি হিসেবে এর আগে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের ম্যাচগুলোকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছেন। সে সময়েও পিচে কিছুটা ঘাস ছিল এবং নতুন বল হাতে পেসাররা সুবিধা পেয়েছিলেন।
জশ ইংলিশ বলেন, “আমরা এখানে অনুষ্ঠিত নিউজিল্যান্ড সিরিজের ম্যাচগুলো দেখেছি। সেখানে উইকেটে কিছুটা ঘাস ছিল। নতুন বল কিছুটা সুইং করছিল এবং পিচটি স্পিনের চেয়ে পেসারদের জন্য বেশি সহায়ক মনে হয়েছিল। আমরা সেই বিষয়গুলো মাথায় রাখছি, তবে আমরা যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।”
অস্ট্রেলিয়ার মূল পেস আক্রমণের বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ তারকা স্কোয়াডে না থাকলেও ইংলিশ তার তরুণ পেস বহরের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। বিশেষ করে নাথান এলিসকে নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী। তিনি বলেন, “আমাদের স্কোয়াডে বড় কিছু নাম হয়তো নেই, তবে যারা গত দুই বছর ধরে নিয়মিত খেলছে—যেমন নাথান এলিস, জাভিয়ের বার্টলেট, বেন ডোয়ারশুইস—তাদের আন্তর্জাতিক স্তরে খেলার ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে। নাথান আমাদের দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়। গত কয়েক বছরে সে যখনই সুযোগ পেয়েছে, নিজেকে প্রমাণ করেছে। তার বোলিংয়ে গতির বৈচিত্র্য রয়েছে এবং সে অত্যন্ত দক্ষ। ম্যাচের তিন ফেজেই সে বল করতে পারে। আমি আশা করি এই সিরিজে সে বড় ভূমিকা পালন করবে।”
নাহিদ রানা: বাংলাদেশের নতুন গতির ঝড়
অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক জশ ইংলিশ বাংলাদেশের নতুন পেস সেনসেশন নাহিদ রানাকে নিয়ে সরাসরি খেলার অভিজ্ঞতা না থাকলেও ভিডিও ফুটেজ দেখে তার সামর্থ্য সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। রানার গতি এবং উচ্চতা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করেন ইংলিশ। তিনি বলেন, “আমি তার খুব বেশি খেলা দেখিনি, তবে যতটুকু দেখেছি তাতে তাকে একজন দারুণ বোলার এবং অত্যন্ত রোমাঞ্চকর প্রতিভা বলে মনে হয়েছে। সে লম্বা এবং বেশ জোরে বল করতে পারে, যা যেকোনো বোলারের জন্য দারুণ এক কম্বিনেশন। তাই আমাদের জন্য তাকে মোকাবিলা করা বেশ কঠিন হবে।”
মেহেদী হাসান মিরাজও স্বীকার করেছেন যে, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে ওডিআই দলে নাহিদ রানাকে ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশের জয়ের মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ ছিল। মিরাজ বলেন, “আমি যখন প্রথম অধিনায়কত্ব পাই, তখন পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন ছিল। দলের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। আমি একটি ভালো টিম কম্বিনেশন তৈরি করতে চেয়েছিলাম এবং আমরা সবাই নাহিদ রানার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানি। সে নিখুঁত লাইনে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বল করতে পারে। যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকায় আসন্ন বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, তাই আমাদের দলে ভালো মানের ফাস্ট বোলার থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই চিন্তা থেকেই আমরা তাকে দলে নিয়েছি এবং আত্মবিশ্বাস ও সাহস দিয়ে তাকে সমর্থন জুগিয়েছি।”
মিডল অর্ডারের দুশ্চнят দূর করার চেষ্টা
গত ১২ মাসে ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ ছিল তাদের ব্যাটিং, বিশেষ করে মিডল অর্ডার ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতার অভাব। তবে অধিনায়ক মিরাজ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) ঘরোয়া লিস্ট-এ ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স দেখে আশাবাদী হচ্ছেন। তৌহিদ হৃদয় ইতিমধ্যেই টুর্নামেন্টে ৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, পাশাপাশি নাজমুল হোসেন শান্ত এবং মোসাদ্দেক হোসেনও ভালো ফর্মে আছেন।
মিরাজ মিডল অর্ডার নিয়ে বলেন, “অতীতে এই পজিশনগুলোতে অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় খেলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সেই জায়গাগুলো পূরণ করতে কিছুটা সময় লাগে। তবে আমার মনে হয় আমরা এখন নিজেদের গুছিয়ে নিতে পেরেছি। যারা মিডল অর্ডারে খেলছেন, তারা ডিপিএলে সেরা পারফর্মারদের মধ্যে অন্যতম। তৌহিদ হৃদয়, মোসাদ্দেক হোসেন ও লিটন দাস—তারা সবাই ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফর্ম করে দলে এসেছেন।”
মোসাদ্দেক হোসেনের প্রত্যাবর্তন ও দলের ভারসাম্য
দীর্ঘ চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে আসা মোসাদ্দেক হোসেন দলের মিডল অর্ডারে দারুণ স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করেন মিরাজ। ঘরোয়া ক্রিকেটে মোসাদ্দেকের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে দলে ফেরাতে বাধ্য করেছে। মিরাজ বলেন, “মোসাদ্দেক অনেক বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফর্ম করছে এবং সে খুব ভালো ক্রিকেট খেলছে। সে দারুণ ফর্মেও আছে। আমার মনে হয় তাকে দলে নেওয়ার এটাই সঠিক সময় ছিল। আমরা তার জন্য যে ভূমিকা নির্ধারণ করেছি, সে যদি তা সঠিকভাবে পালন করতে পারে তবে দলের জন্য তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে।”
এছাড়া মোসাদ্দেকের অফস্পিন বোলিং দলের বোলিং আক্রমণে একটি বাড়তি বিকল্প যোগ করবে বলে মনে করেন অধিনায়ক। “যদি আমাদের এমন একটি বিকল্প থাকে, তবে তা দলকে অনেক সাহায্য করবে। আপনি যখন পাঁচজন মূল বোলার নিয়ে খেলবেন এবং আপনার কাছে ষষ্ঠ বোলিং অপশন থাকবে, তখন অধিনায়ক হিসেবে আপনার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যাবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে সে বল হাতে নিজেকে প্রমাণ করেছে। সে যদি সঠিক জায়গায় বল করতে পারে, তবে তা দলের জন্য মঙ্গলজনক হবে।”
দ্বন্দ্বের গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন মিরাজ
গত বছর প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেনের একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে মিরাজ দলে থাকলে মোসাদ্দেক সুযোগ পাবেন না। তবে এই ধরণের কোনো দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব উড়িয়ে দিয়ে মিরাজ বলেন, “আমরা দুজনে একসাথে বাংলাদেশ দলে অনেক বছর ধরে খেলছি (প্রায় ৩৯টি ম্যাচ)। আমরা ২০১৯ বিশ্বকাপেও একসাথে খেলেছি, তাই এখানে নতুন কোনো বিষয় নেই। মোসাদ্দেক তার ভূমিকা পালন করবে এবং আমি আমারটি। মোসাদ্দেক মূলত একজন ব্যাটিং অলরাউন্ডার এবং আমি একজন বোলিং অলরাউন্ডার। তাই আমাদের দুজনের ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা।”
সব মিলিয়ে, মিরপুরের সবুজ ঘাসের পিচে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাংলাদেশ দল পুরোপুরি প্রস্তুত এবং অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের অধীনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিরিজের অপেক্ষায় দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।
