এমএস ধোনির ব্যাটিং নিয়ে বিস্ফোরক সৌরভ গাঙ্গুলি: ২০১৯ বিশ্বকাপের হারের স্মৃতিচারণ
এমএস ধোনি এবং সৌরভ গাঙ্গুলির সম্পর্ক: এক অমিমাংসিত বিশ্লেষণ
ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এমএস ধোনি এক অবিস্মরণীয় নাম। তবে আইপিএল ২০২৬-এ চেন্নাই সুপার কিংসের (সিএসকে) হয়ে তার অংশগ্রহণ নিয়ে জল্পনা যেন থামছেই না। ৪৪ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি উইকেটকিপার-ব্যাটার আসরের শুরু থেকেই কাফ ইনজুরিতে ভুগছেন। যদিও তার অনুপস্থিতিতে রুতুরাজ গায়কোয়াড়ের নেতৃত্বে সিএসকে ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরেছে, তবুও ধোনির মাঠের উপস্থিতি সবসময়ই একটি আলাদা আভা তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই সৌরভ গাঙ্গুলি ধোনির ব্যাটিং শৈলীর সমালোচনা করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
ধোনির ক্যারিয়ারের দুই পর্ব ও সৌরভের মূল্যায়ন
সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বেই ধোনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৪৮ রানের সেই ‘ভলক্যানিক ভিজাগ’ ইনিংস কিংবা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ১৮৩ রান—সবই ছিল দাদার অধিনায়কত্বের সময়। সৌরভের মতে, ধোনির ক্যারিয়ারের প্রথম পর্বটি ছিল অসাধারণ। সেই সময়ে ধোনি ক্রিজে এলে চার-ছক্কার বন্যা বইয়ে দিতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ধোনি যে রক্ষণাত্মক ব্যাটিংয়ের পথে হেঁটেছেন, তা সৌরভের কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি।
এক সাক্ষাৎকারে সৌরভ বলেন, ‘আমি খুব কম খেলোয়াড় দেখেছি যারা ধোনির মতো অনায়াসে ছক্কা মারতে পারতেন। আমার অধিনায়কত্বের সময় যখন সে দলে এল, তখন সে প্রচুর ছক্কা মারত। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে ধোনির ব্যাটিং আমার খুব একটা ভালো লাগত না। সে কেন পরে সিঙ্গলস বা ডাবলসের দিকে বেশি মনোযোগ দিত, তা আমার বোধগম্য ছিল না। যদিও পরে সে ভারতের একজন বিশাল বড় খেলোয়াড় ও অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’
২০১৯ বিশ্বকাপ: যেখানে হারিয়ে গেল ‘মিডাস টাচ’
ধোনি মানেই ছিল রান তাড়া করার সময় ম্যাচ শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং ফিনিশারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। কিন্তু ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে তার সেই ‘মিডাস টাচ’ ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করে। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল এর বড় প্রমাণ। ভারতের টপ অর্ডার ভেঙে পড়ার পর ধোনি ও রবীন্দ্র জাদেজা লড়াই চালিয়েছিলেন। জাদেজা আউট হওয়ার পর ধোনির ওপর দায়িত্ব ছিল ম্যাচটি বের করে আনার, কিন্তু তিনি সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হন।
ধোনি নিজেও পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেছেন যে, সেই পরাজয় তাকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করেছিল এবং তখনই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন। সৌরভ গাঙ্গুলি ইঙ্গিত করেছেন যে, ধোনির সেই রক্ষণাত্মক ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ হয়তো বড় ম্যাচে ভারতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আইপিএল ২০২৬ এবং ধোনির ভবিষ্যৎ
২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও, ধোনি এখনও আইপিএলে সিএসকের হয়ে খেলছেন এবং আন্তর্জাতিক অবসরের পরেও দুটি শিরোপা জিতেছেন। তবে ২০২৬ সালের আইপিএলকেই অনেকেই তার শেষ আসর হিসেবে দেখছেন। যদিও ইনজুরির কারণে তিনি এখনও মাঠে নামতে পারেননি, তবে ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই কিংবদন্তি শেষবারের মতো চেন্নাইয়ের হলুদ জার্সিতে জ্বলে ওঠার দৃশ্য দেখার জন্য।
সৌরভ গাঙ্গুলির এই মন্তব্য কি ধোনির ক্যারিয়ারের প্রতি এক ধরনের তাচ্ছিল্য, নাকি এক প্রাক্তন অধিনায়কের গঠনমূলক সমালোচনা—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ধোনি ভারতীয় ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রতিটি বাঁকই ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এক একটি গল্পের মতো। এখন দেখার বিষয়, ধোনি কি সিএসকের হয়ে চলতি আইপিএলের বাকি ম্যাচগুলোতে মাঠে ফিরতে পারেন, নাকি মাঠের বাইরে থেকেই তাকে মৌসুম শেষ করতে হয়।
ভারতীয় ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের এই দুই স্তম্ভের সম্পর্ক এবং ক্রিকেটীয় মতাদর্শ সবসময়ই নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। ধোনির ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান যাই বলুক, সৌরভের এই অকপট স্বীকারোক্তি ধোনির সেই বিধ্বংসী মেজাজের কথা আবারও মনে করিয়ে দিল, যার জন্য বিশ্ব ক্রিকেট তাকে চিনেছিল।
