প্রাক্তন নির্বাচকের রুতুরাজ গায়কোয়াডকে আক্রমণ: চেন্নাই অধিনায়ককে ‘সাধারণ ক্রিকেটার’ বললেন শ্রীকান্ত
ক্রিকেট জগতে বিতর্ক এবং সমালোচনার ধারা নতুন কিছু নয়, তবে যখন একজন প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক এবং নির্বাচক সরাসরি একজন তরুণ অধিনায়কের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তা অবশ্যই আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি, চেন্নাই সুপার কিংস (CSK) এর অধিনায়ক রুতুরাজ গায়কোয়াডকে নিয়ে এমনই কড়া মন্তব্য করেছেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত। লখনউ সুপার জায়ান্টস (LSG) এর কাছে চেন্নাইয়ের হারের পর শ্রীকান্ত গায়কোয়াডকে ‘সাধারণ ক্রিকেটার’ আখ্যা দিয়েছেন, যা ক্রিকেট মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
লখনউতে লখনউ সুপার জায়ান্টসের কাছে সিএসকে-র এই পরাজয় দলটির প্লেঅফ ভাগ্যকে আরও জটিল করে তুলেছে। আইপিএল ২০২৬ এর লিগ পর্ব থেকে টানা তৃতীয়বারের মতো বাদ পড়া এড়াতে হলে সিএসকে-কে তাদের বাকি দুটি ম্যাচই ভালো নেট রান রেট সহ জিততে হবে। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে, শ্রীকান্তের এই ধরনের কঠোর সমালোচনা দলের morale-এর উপর কী প্রভাব ফেলবে তা দেখার বিষয়।
লখনউয়ের বিরুদ্ধে সিএসকে-র হতাশাজনক পারফরম্যান্স
লখনউ সুপার জায়ান্টস এই মৌসুমের প্লেঅফ দৌড় থেকে ইতিমধ্যেই ছিটকে গেছে। তাই শুক্রবারের ম্যাচে তাদের হারানোর কিছু ছিল না, যা তাদের আরও নির্ভীক ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দিয়েছিল। অন্যদিকে, সিএসকে-র জন্য এই ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের পারফরম্যান্স ছিল আশানুরূপের চেয়ে অনেক নিচে।
ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে চেন্নাই সুপার কিংসের টপ অর্ডার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। লখনউয়ের বাঁহাতি পেসার আকাশ সিং, যিনি এই মৌসুমে তার প্রথম ম্যাচ খেলছিলেন, মাত্র আট ওভারের মধ্যেই সিএসকে-র প্রথম তিন ব্যাটারকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান। এরপর কার্তিক শর্মা এবং ডিওয়াল্ড ব্রেভিস চতুর্থ উইকেটে ৭০ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। শর্মা ৭১ রান করে অর্ধশতক পূর্ণ করার পর আউট হন। শেষ চার ওভারে শিবম দুবে এবং প্রশান্ত বীর কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, তবে শেষের ওভারে ২৩ রান যোগ হওয়ার আগে তারা সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেননি। সিএসকে শেষ পর্যন্ত একটি লড়াকু স্কোর গড়তে সক্ষম হলেও, তা জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
মিচেল মার্শের বিধ্বংসী ইনিংস এবং লখনউয়ের সহজ জয়
লক্ষ্য তাড়ায় লখনউ সুপার জায়ান্টসের হয়ে একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডার মিচেল মার্শ। তিনি ফিল্ডিং বিধিনিষেধের (পাওয়ারপ্লে) দারুণ সদ্ব্যবহার করে মাত্র ২১ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন। মার্শ বিশেষ করে অংশুল কাম্বোজের উপর চড়াও হন। এই হরিয়ানা বোলারকে পঞ্চম ওভারে ২৮ রান মারেন, যার মধ্যে টানা চারটি ছক্কা ছিল।
মার্শের সাথে জশ ইংলিস কিছুটা মন্থর গতিতে ব্যাট করলেও, তিনি মার্শের দারুণ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। এই দুই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার প্রথম উইকেটে ১৩৫ রানের বিশাল জুটি গড়েন। দুর্ভাগ্যবশত, ইনিংসের দ্বাদশ ওভারেই তারা দুজন আউট হয়ে যান। ইংলিস মুকেশ চৌধুরীর বলে আউট হন, আর পরের বলেই অতিরিক্ত ব্যাকআপ করতে গিয়ে রান আউট হন মার্শ। তিনি ৩৮ বলে ৯০ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন।
তবে ততক্ষণে ম্যাচের বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। লখনউয়ের জয়ের জন্য শেষ ২৪ বলে মাত্র ২৪ রানের প্রয়োজন ছিল। কাম্বোজকে আবারও বোলিংয়ে আনা হয়, এবং নিকোলাস পুরান তাকে আবারও টানা চারটি ছক্কা মেরে লখনউকে একটি সান্ত্বনামূলক জয় এনে দেন। এই পারফরম্যান্স অংশুল কাম্বোজের জন্য একটি দুঃস্বপ্নের মতো ছিল, যেমনটি অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অংশুল কাম্বোজ আইপিএল ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ বোলার হয়েছেন? এই চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান তা প্রমাণ করে।’
শ্রীকান্তের কড়া সমালোচনা: ‘রুতুরাজ পুরো মৌসুম জুড়ে সাধারণ ছিলেন’
লখনউয়ের বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত তার ইউটিউব চ্যানেলে আবারও মুখ খোলেন। এবার তার সমালোচনার মূল লক্ষ্য ছিলেন সিএসকে অধিনায়ক রুতুরাজ গায়কোয়াড। শ্রীকান্ত গায়কোয়াড এবং তার ওপেনিং পার্টনার, সানজু স্যামসনের (এই বিষয়ে তথ্যের অসামঞ্জস্যতা থাকলেও, শ্রীকান্তের বক্তব্য অনুযায়ী) গোটা মৌসুমে কোনো উল্লেখযোগ্য ওপেনিং পার্টনারশিপ গড়তে না পারার জন্য তাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি শুক্রবারের ম্যাচে তাদের দুর্বল পারফরম্যান্সকেও ধুয়ে দেন।
শ্রীকান্ত তার চ্যানেলে বলেন, “সানজু এবং রুতুরাজ পুরো মৌসুমে একটিও উল্লেখযোগ্য জুটি গড়তে পারেননি। ওপেনাররাই সাফল্যের চাবিকাঠি। গায়কোয়াড পুরো মৌসুম জুড়েই সাধারণ ছিলেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “সানজু, প্রথম ওভারের পর সবকিছু গোলমাল করে দেন, ঠিক যেমন রুতুরাজ গায়কোয়াড করেছিলেন। লখনউয়ের বোলাররা তাদের কখনো ড্রাইভ করার মতো বল দেয়নি। দুজনকেই আটকে রাখা হয়েছিল। যদিও ইংলিস খুব বেশি রান করেননি, তবে মার্শের সাথে তার জুটিই ছিল মূল পার্থক্য।”
শুক্রবার ম্যাচে, সানজু ২০ বলে ২০ রান করেন, যখন রুতুরাজ গায়কোয়াড মাত্র ৯ বলে ১৩ রান করে আউট হন। এই পরিসংখ্যান শ্রীকান্তের অভিযোগকে আরও জোরালো করে তোলে। ওপেনিং জুটি থেকে একটি মজবুত শুরু না পাওয়াটা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
সিএসকে-র প্লেঅফ সম্ভাবনা এবং সামনের চ্যালেঞ্জ
যদিও সিএসকে-র প্লেঅফ থেকে এখনো বাদ পড়েনি, তবে তাদের পরিস্থিতি বেশ নাজুক। শ্রীকান্তও এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, “সিএসকে এখনো বাদ পড়েনি। মৌসুমের শুরুতে সবাই পাঞ্জাব কিংসকে নিয়ে অনেক hype তৈরি করেছিল। কিন্তু তারা এখন ধুঁকছে এবং এক বিপদজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। পাঞ্জাবের পতনের ফলে এবং সিএসকে-র এই পরাজয়ে রাজস্থান রয়্যালস সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদও একটি ভয়াবহ পরাজয়ের পর আসছে। তাই উভয় দলই অনেক উত্তেজনা নিয়ে সেই ম্যাচ খেলবে।”
রুতুরাজ গায়কোয়াডের নেতৃত্বে সিএসকে-কে এখন তাদের পরবর্তী দুটি ম্যাচে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখাতে হবে। ২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়নদের কার্যত দুটি ম্যাচেই জিততে হবে এবং তাদের নেট রান রেট উন্নত করতে হবে প্লেঅফের জন্য যোগ্যতা অর্জনের জন্য।
সিএসকে-র পরবর্তী ম্যাচগুলি হল: ১৮ মে চেন্নাইয়ে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে এবং ২১ মে আহমেদাবাদে গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে। এই দুটি ম্যাচই তাদের মৌসুমের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। গায়কোয়াডকে তার ব্যাট এবং অধিনায়কত্ব উভয় দিক থেকেই নেতৃত্ব দিতে হবে যদি সিএসকে আবারও আইপিএল ফাইনালে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।
এই কঠিন সময়ে, রুতুরাজ গায়কোয়াডের উপর চাপ থাকবে ব্যাপক। শ্রীকান্তের মতো একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের কাছ থেকে এই ধরনের সরাসরি সমালোচনা নিঃসন্দেহে তার মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে একজন প্রকৃত অধিনায়ক এই চাপকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে দলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। সিএসকে ভক্তরা আশা করবে, তাদের অধিনায়ক এই চ্যালেঞ্জে সফল হবেন এবং দলকে প্লেঅফে নিয়ে যাবেন।
