মাইকেল ভনের তোপ: আইপিএল ২০২৬-এর জন্য লর্ডস টেস্ট মিস করছেন জোফরা আর্চার, উত্তাল ক্রিকেট মহল
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট বনাম জাতীয় দল: মাইকেল ভনের তীব্র সমালোচনা
ইংল্যান্ড ক্রিকেটে এক নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন জোফরা আর্চার জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজের প্রস্তুতি ছেড়ে আইপিএল ২০২৬-এ ব্যস্ত রয়েছেন। যেখানে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে আর্চারকে দেখা যাচ্ছে রাজস্থান রয়্যালসের জার্সিতে। এই বিষয়টি ভন একেবারেই সহজভাবে নিতে পারছেন না।
আগামী ৪ জুন লর্ডসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া গ্রীষ্মকালীন মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইংল্যান্ডের অন্যতম দ্রুততম পেসার জোফরা আর্চারকে এই টেস্টের স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ECB) যদিও দাবি করছে যে তারা আর্চারের ইনজুরি পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করছে, কিন্তু ভন মনে করেন বর্তমান পরিস্থিতি আধুনিক ক্রিকেটের অগ্রাধিকার নিয়ে ভুল বার্তা দিচ্ছে।
ইসিবি এবং বিসিসিআই চুক্তির নেপথ্যে ভনের ক্ষোভ
মাইকেল ভন ইসিবি এবং বিসিসিআই-এর মধ্যে হওয়া বর্তমান ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। এই চুক্তির ফলে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা আইপিএলের পুরো মৌসুম খেলার অনুমতি পাচ্ছেন, এমনকি যখন ইংল্যান্ডের আন্তর্জাতিক ম্যাচ সামনে থাকে তখনও। ক্রিকবাজের সাথে আলাপকালে ভন বলেন, “আমার মনে হয় ইংল্যান্ড ক্রিকেটে বর্তমানে একটি বড় সমস্যা চলছে। জোফরা নিশ্চিতভাবেই আইপিএলের পুরো মৌসুমের জন্য সেখানে অবস্থান করছে। ইসিবি এবং বিসিসিআই-এর মধ্যে এমন কোনো চুক্তি হয়েছে যা আমাদের খেলোয়াড়দের পুরো সময় আইপিএলে থাকার অনুমতি দিচ্ছে।”
ভন আরও যোগ করেন যে, তিনি আশা করেছিলেন অন্তত দ্বিতীয় টেস্টের জন্য আর্চারকে দলে রাখা হবে। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে সেই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে মূল সমস্যাটি হলো অগ্রাধিকার নিয়ে। যখন দেশের হয়ে টেস্ট ম্যাচ খেলার সময় আসে, তখন খেলোয়াড়দের আইপিএলে থাকাটা ক্রিকেটীয় সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে তিনি মনে করেন।
আর্চারের ইনজুরি এবং ইসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি
গত কয়েক বছর ধরে জোফরা আর্চার গুরুতর চোটের সমস্যার সাথে লড়াই করছেন। এই কঠিন সময়ে ইসিবি তাকে কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় রেখে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। ভনের মতে, যেহেতু বোর্ড তার খারাপ সময়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, তাই বোর্ডের উচিত ছিল আর্চারের ফেরার সময়টি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিশেষ করে ঘরের মাঠে বড় কোনো টেস্ট সিরিজের আগে তাকে জাতীয় দলে ফেরানোই ছিল যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
ভন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যদি এমনটাই হয়, তবে ইংল্যান্ডের চুক্তিগুলো নিয়ে আমার আপত্তি আছে। জোফরা গত কয়েক বছর ধরে ইসিবির খুব ভালো অঙ্কের চুক্তিতে সুরক্ষিত ছিলেন। তাহলে এই সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি কার হাতে? আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির চেয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি সবসময় বেশি শক্তিশালী হওয়া উচিত। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো দারুণ, আমি খেলোয়াড়দের জন্য এগুলো পছন্দ করি। কিন্তু যদি আমরা টেস্ট ম্যাচের ওপর ঘরোয়া লিগগুলোকে স্থান দিতে শুরু করি, তবে ক্রিকেটে বড় ধরণের সমস্যা তৈরি হবে।”
টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা
ভন মনে করেন, কেন্দ্রীয় চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সবসময় প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তার মতে, যদি জাতীয় বোর্ডগুলো ঘরের মাঠে টেস্ট ম্যাচ চলাকালীন খেলোয়াড়দের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার অনুমতি দেয়, তবে ক্রিকেটের ভারসাম্য ধীরে ধীরে ভুল দিকে মোড় নেবে। এটি একটি বিপদজনক নজির তৈরি করতে পারে, যেখানে ভবিষ্যতে আরও অনেক খেলোয়াড় জাতীয় দলের আগে লিগ ক্রিকেটকে বেছে নেবেন।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, ভবিষ্যতে বোর্ডগুলো যদি আইপিএল এবং আন্তর্জাতিক সূচির মধ্যে এমন সংঘর্ষ তৈরি করে, তবে সমস্যা আরও বাড়বে। খেলোয়াড়রা ইসিবি এবং বিসিসিআই-এর মধ্যকার এই ধরণের চুক্তির কারণে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। ভনের পরামর্শ হলো, “যদি ইসিবি এবং বিসিসিআই-এর মধ্যে এমন কোনো সমঝোতা থাকেই, তবে তোমাদের টেস্ট গ্রীষ্ম আরও কিছুটা দেরি করে শুরু করা উচিত।”
সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের প্রতি বার্তা
সাবেক এই অধিনায়ক আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, তিনি যদি ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ডিরেক্টর রব কি কিংবা কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের জায়গায় হতেন, তবে তিনি চাইতেন তার সেরা ফাস্ট বোলার লর্ডসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলুক। আইপিএলে বসে থাকাটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভনের এই কড়া মন্তব্য ইংল্যান্ডের ক্রিকেট মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর্চারের মতো প্রতিভাবান বোলারের দীর্ঘ ফরম্যাটে অনুপস্থিতি এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রতি বোর্ডের এই নমনীয় মনোভাব আগামীর টেস্ট ক্রিকেটের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত জোফরা আর্চার দ্বিতীয় টেস্টে দলে ফেরেন কি না এবং ইসিবি তাদের ভবিষ্যৎ নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, তা দেখার জন্য ক্রিকেট বিশ্ব মুখিয়ে আছে। তবে ভনের এই প্রতিবাদ আবারও প্রমাণ করল যে, আধুনিক ক্রিকেটে ক্লাব বনাম দেশের লড়াই এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
