Suresh Raina’s 87 Off 25: The IPL Knock That Lasted 30 Minutes But Lives On Fore – সুরেশ রায়নার ২৫ বলে ৮৭: আইপিএল ইতিহাসের অবিস্মরণীয় সেই ৩০ মিনিট
ওয়াংখেড়ের সেই অবিস্মরণীয় রাত এবং সুরেশ রায়নার মহাকাব্য
আইপিএলের দীর্ঘ এবং বর্ণিল ইতিহাসে বহু দুর্দান্ত ইনিংস খেলা হয়েছে। বহু ব্যাটসম্যান মাঠ কাঁপিয়েছেন, দর্শকদের বিনোদিত করেছেন। কিন্তু এমন কিছু ইনিংস থাকে যা কেবল ম্যাচ জেতানোর জন্য নয়, বরং ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় নিজেদের চিরকালের জন্য খোদাই করে নেওয়ার জন্য খেলা হয়। এমনই এক অবিস্মরণীয় ইনিংসের জন্ম দিয়েছিলেন ‘মিস্টার আইপিএল’ খ্যাত সুরেশ রায়না। ২০১৪ সালের ৩০ মে, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে কোয়ালিফায়ার ২ ম্যাচে রায়নার ব্যাট থেকে আসা সেই ২৫ বলে ৮৭ রানের টর্নেডো ইনিংসটি আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে শিহরণ জাগায়। মাত্র আধ ঘণ্টার সেই তাণ্ডব আইপিএলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা বিধ্বংসী ইনিংস হিসেবে বিবেচিত হয়।
পর্বতসম লক্ষ্য এবং শুরুর ধাক্কা
সেদিন ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় চেন্নাই সুপার কিংস। কিন্তু বীরেন্দর শেবাগের ১২২ রানের এক বিধ্বংসী শতকের ওপর ভর করে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব স্কোরবোর্ডে রেকর্ড ২২৬ রানের পাহাড় গড়ে তোলে। ফাইনালের টিকিট পেতে চেন্নাইয়ের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২২৭ রান। এত বড় রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় সিএসকে। প্রথম ওভারেই খাতা খোলার আগে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার ফাফ ডুপ্লেসিস। স্টেডিয়াম জুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। চেন্নাই সমর্থকরা যখন আশঙ্কার মেঘ দেখছেন, ঠিক তখনই তিন নম্বরে মাঠে প্রবেশ করেন সুরেশ রায়না। আর তারপর যা ঘটেছিল, তা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
বোলারদের ওপর রায়নার নির্দয় শাসন
ক্রিজে এসেই কোনো রকম সময় নষ্ট করেননি রায়না। তিনি যেন প্রতিজ্ঞা করেই নেমেছিলেন যে পাঞ্জাবের কোনো বোলারকেই থিতু হতে দেবেন না। মিচেল জনসনের গতি, সন্দীপ শর্মার সুইং কিংবা পারভিন্দর আওয়ানার লাইন-লেন্থ—সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঠের চারদিকে বাউন্ডারির বন্যা বইয়ে দেন রায়না। বিশেষ করে পাওয়ারপ্লের ষষ্ঠ ওভারে পারভিন্দর আওয়ানাকে তুলোধোনা করেন তিনি। সেই ওভারে দুটি নো-বল সহ মোট ৩৩ রান নেন রায়না, যা আইপিএলের ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল ওভার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
রায়না মাত্র ১৬ বলে নিজের অর্ধশতক পূর্ণ করেন, যা সেই সময় আইপিএলের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরি ছিল। তার ব্যাট থেকে আসা প্রতিটি শট ছিল টাইমিং এবং শক্তির অপূর্ব সংমিশ্রণ। ২৫ বল খেলে ৮৭ রান করার পথে তিনি মারেন ১২টি চার এবং ৮টি দৃষ্টিনন্দন ছক্কা। অর্থাৎ, তার খেলা ২৫টি বলের মধ্যে ২০টি বলই বাউন্ডারি লাইনের বাইরে আছড়ে পড়েছিল। পাঞ্জাবের বোলাররা কোথায় বল করবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না, আর ওয়াংখেড়ের গ্যালারি মেতে উঠেছিল রায়না-ঝড়ে।
পাওয়ারপ্লেতে ১০০ রান এবং একটি ট্র্যাজিক রান আউট
রায়নার এই অতিমানবীয় ব্যাটিংয়ের সৌজন্যে চেন্নাই সুপার কিংস পাওয়ারপ্লের ৬ ওভারেই স্কোরবোর্ডে ১০০ রান তুলে ফেলে, যা পাওয়ারপ্লেতে আইপিএল ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান। এই ১০০ রানের মধ্যে ৮৭ রানই এসেছিল রায়নার ব্যাট থেকে। চেন্নাই তখন জয়ের সুবাস পেতে শুরু করেছে এবং ম্যাচটি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু ক্রিকেটের ভাগ্যদেবতা হয়তো সেদিন অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন।
ঠিক যখন মনে হচ্ছিল রায়না তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা শতরানটি করতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই ঘটে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। পাঞ্জাবের কোনো বোলার তাকে আউট করতে পারেননি, বরং জর্জ বেলির একটি দুর্দান্ত ডিরেক্ট থ্রোতে রান আউট হয়ে সাজঘরে ফিরতে হয় রায়নাকে। ব্রেন্ডন ম্যাককালামের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে মাত্র ১৩ রান দূরে থাকতে তার এই মহাকাব্যিক ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। রায়না যখন মাঠ ছাড়ছেন, তখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানাচ্ছিল।
সহযোদ্ধাদের ব্যর্থতা এবং চেন্নাইয়ের পরাজয়
রায়না যখন আউট হন, তখন সিএসকের স্কোর ছিল ৬.১ ওভারে ১০০ রান। জয়ের জন্য বাকি ৮৩ বলে প্রয়োজন ছিল মাত্র ১২৭ রান, যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অত্যন্ত সহজসাধ্য সমীকরণ। ক্রিজে তখনও মহেন্দ্র সিং ধোনি, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম এবং রবীন্দ্র জাদেজার মতো বিশ্বমানের ব্যাটসম্যানরা বাকি ছিলেন। কিন্তু রায়না চলে যাওয়ার সাথে সাথেই যেন চেন্নাইয়ের ইনিংসের সমস্ত গতি হারিয়ে যায়।
পাঞ্জাবের বোলাররা দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসে এবং চেন্নাইয়ের ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে সিএসকে ২০২ রান করতে সক্ষম হয় এবং ২৪ রানে ম্যাচটি হেরে যায়। ম্যাচ হেরে আইপিএল থেকে বিদায় নেয় চেন্নাই সুপার কিংস, আর পাঞ্জাব চলে যায় ফাইনালে। কিন্তু ম্যাচ হারলেও সেদিন কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন সুরেশ রায়না।
এক দশক পরেও কেন এই ইনিংস অনন্য?
সাধারণত পরাজিত দলের কোনো ইনিংস সময়ের সাথে সাথে মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু রায়নার এই ৮৭ রানের ইনিংসটি এতটাই বিশেষ ছিল যে, এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও ক্রিকেট মহলে এটি নিয়ে আলোচনা হয়। আজ ২০২৬ সালেও যখনই আইপিএলের কোনো বিধ্বংসী ইনিংসের কথা ওঠে, সবার আগে উঠে আসে রায়নার এই ইনিংসের নাম।
আইপিএলের ইতিহাসে ক্রিস গেইল ২৫ বলে সবচেয়ে বেশি রান করার রেকর্ড গড়লেও, নিজের ইনিংসের প্রথম ২৫ বলে ৮৭ রান করার রেকর্ড আজ পর্যন্ত কেউ ভাঙতে পারেনি। এটিই প্রমাণ করে রায়না সেদিন কোন স্তরের ব্যাটিং করেছিলেন। ওয়াংখেড়ের মাঠে মাত্র ৩০ মিনিটের সেই ঝড় আজীবন টিকে থাকবে ক্রিকেট ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে। সুরেশ রায়না হয়তো সেদিন চেন্নাইকে জেতাতে পারেননি, কিন্তু তিনি যা উপহার দিয়েছিলেন, তা জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে এক পরম ক্রিকেটীয় আনন্দ।
