নাহিদ রানা কি আইপিএলে যাচ্ছেন? বাবর আজমকে কাঁপানোর পর সতর্কবার্তা তামিম ইকবালের
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জোয়ার এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ
বর্তমান যুগে অনেক ক্রিকেটারই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটারদের এই সিদ্ধান্ত এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দিন দিন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে বেড়েই চলেছে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL), পাকিস্তান সুপার লিগ (PSL), বিগ ব্যাশ লিগ (BBL) এবং দ্য হানড্রেডের মতো টুর্নামেন্টগুলো ক্রিকেটারদের বিশাল অঙ্কের চুক্তি এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিতির প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করছে।
সম্প্রতি ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক এবং বিসিবির অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি তামিম ইকবাল ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট এবং তরুণ পেস সেনসেশন নাহিদ রানাকে নিয়ে নিজের অকপট মতামত তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পক্ষে তামিম ইকবালের দৃঢ় অবস্থান
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সাক্ষাৎকারে তামিম ইকবালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—যদি নাহিদ রানার মতো তরুণ ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব এড়িয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে বেছে নেন, তবে তা কতটা উদ্বেগজনক? এই প্রশ্নের উত্তরে তামিম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি জানান, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর জনপ্রিয়তা যতই বাড়ুক না কেন, বেশিরভাগ ক্রিকেটারের কাছে দেশের হয়ে খেলার আবেগ ও মূল্য এখনও অন্য সবকিছুর চেয়ে অনেক ওপরে।
তামিমের মতে, বিশ্বের অনেক ক্রিকেটারই ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলো থেকে বিশাল অঙ্কের অফার পান, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা জাতীয় দলের হয়ে খেলাকেই প্রথম অগ্রাধিকার দেন। যদিও কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে এবং কিছু খেলোয়াড় পুরোপুরি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের পথ বেছে নিতে পারেন, তবে অধিকাংশ খেলোয়াড় এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকেই সবকিছুর উপরে স্থান দেবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
তামিম ইকবাল বলেন, “এমন একটি জিনিস আছে যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না, আর তা হলো নিজের দেশের হয়ে খেলার আবেগ। যদি টাকার খেলাই সব হতো, তবে ৮০ শতাংশ ক্রিকেটারই সেই পথ বেছে নিতেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রতি আমার সর্বোচ্চ সম্মান রয়েছে, কিন্তু যখন আপনি আপনার দেশ এবং জাতির জন্য খেলেন, সেটি এমন কিছু যা আপনি টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এমনকি আপনার দেশেও সুপারস্টাররা বড় বড় অফার পেতে পারেন, কিন্তু তারা তবুও দেশের হয়ে খেলেন। এগুলো এমন কিছু বিষয় যা দেশাত্মবোধ থেকে আসে। আমি যদি এটিকে ফুটবলের সাথে তুলনা করি, তবে সেখানে খেলোয়াড়রা লক্ষ লক্ষ ডলার পাচ্ছেন, কিন্তু যখন দেশের হয়ে খেলার সুযোগ আসে, তারা তখনও গিয়ে দেশের হয়েই খেলেন। এমন কিছু বিষয় আছে যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না এবং দেশের হয়ে খেলার এই অনুভূতি কখনোই পরিবর্তন হবে না। হ্যাঁ, কিছু ব্যতিক্রম থাকবে এবং অল্প কিছু ক্রিকেটার হয়তো সেই পথ বেছে নিতে পারেন, তবে আপনি যদি আমাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা জিজ্ঞাসা করেন, আমি মনে করি না যে এতে কোনো পরিবর্তন আসবে।”
তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রলোভন ও নাহিদ রানা
তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বিশ্বজুড়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের সুযোগ হাতছাড়া করা কতটা কঠিন, তা বোঝাতে তামিম ইকবাল তরুণ পেসার নাহিদ রানার উদাহরণ টানেন। নাহিদ রানার মতো তরুণ প্রতিভাদের সামনে যখন কোটি টাকার ফ্র্যাঞ্চাইজি অফার আসে, তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা সত্যিই এক বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের বিপক্ষে নাহিদ রানার বিধ্বংসী পারফরম্যান্স
সম্প্রতি পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর সংবাদ শিরোনামে উঠে আসেন নাহিদ রানা। পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশকে ২-০ ব্যবধানে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জেতাতে এই তরুণ পেসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পুরো সিরিজে তার গতি ও আগ্রাসন প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছিল।
নাহিদ রানা এই টেস্ট সিরিজের চার ইনিংসে মোট ১১টি উইকেট শিকার করেন এবং নিজের এক্সপ্রেস গতি দিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপকে ক্রমাগত চাপে রাখেন। তার সেরা পারফরম্যান্সটি এসেছিল সিরিজের প্রথম টেস্টে, যেখানে তিনি দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৪০ রান দিয়ে ৫টি উইকেট তুলে নেন। তার এই বিধ্বংসী স্পেলের সামনে বাবর আজমের মতো বিশ্বমানের ব্যাটাররাও অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।
পিএসএল এবং বাবর আজমের মুখোমুখি লড়াই
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলো ছড়ানোর আগেই নাহিদ রানা পাকিস্তান সুপার লিগে (PSL) খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। পিএসএলে তিনি বাবর আজমের নেতৃত্বে পেশোয়ার জালমির হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছিলেন। সেই আসরে ৫ ইনিংসে ৯টি উইকেট নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিটিকে শিরোপা জেতাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন নাহিদ।
মজার ব্যাপার হলো, পিএসএলে যে বাবর আজমের অধীনে খেলেছিলেন নাহিদ, সেই বাবর আজমকেই পরে টেস্ট সিরিজে প্রতিপক্ষ হিসেবে পান তিনি। টেস্ট সিরিজে নাহিদ রানার এক্সপ্রেস গতির সামনে বাবর আজমকে বেশ সংগ্রাম করতে দেখা গেছে। রানার গতি এবং সুইং সামলাতে বাবর রীতিমতো হিমশিম খেয়েছেন।
টেস্ট সিরিজ ছাড়াও পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও দারুণ ধারাবাহিক ছিলেন নাহিদ রানা। ৩টি ওয়ানডে ম্যাচে তিনি ৮টি উইকেট শিকার করে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেন। তার এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, বিশেষ করে আইপিএলের নজর এখন এই বাংলাদেশি স্পিডস্টারের দিকে।
উপসংহার
নাহিদ রানার মতো তরুণ প্রতিভাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য যেমন গর্বের, তেমনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের ধরে রাখা বিসিবির জন্য এক বড় পরীক্ষা। তামিম ইকবালের এই সতর্কবার্তা দেশের তরুণ ক্রিকেটারদের সঠিক পথ বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করবে বলে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের ধারণা। এখন দেখার বিষয়, আইপিএল বা অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের বিশাল অঙ্কের প্রস্তাবের মুখে দাঁড়িয়ে নাহিদ রানা দেশের হয়ে খেলার এই আবেগকে কতটা প্রাধান্য দিতে পারেন।
