অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে মোহাম্মদ রিজওয়ানকে ‘শাস্তি’ দিতে পারে পিসিবি
অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে বড়সড় সংকটে মোহাম্মদ রিজওয়ান
পাকিস্তান ক্রিকেটে আবারও পরিবর্তনের হাওয়া। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগে বড়সড় ও কঠোর সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। ক্রিকেট পাড়ায় জোর গুঞ্জন উঠেছে, অভিজ্ঞ উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রিজওয়ানকে দল থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে, যাকে অনেকেই পিসিবির পক্ষ থেকে এক ধরনের ‘শাস্তি’ হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যাট হাতে তার ধারাবাহিক ব্যর্থতাই তাকে এমন কঠিন ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশ দলের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর থেকেই এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের দলের অবদান নিয়ে নানা মহল থেকে তীব্র সমালোচনা আসছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বোর্ড।
রিজওয়ানের ওয়ানডে ক্যারিয়ার কি হুমকির মুখে?
জিও নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজে রিজওয়ানকে স্কোয়াডে রাখা নাও হতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা ব্যাটসম্যান বিগত বেশ কয়েকটি সিরিজ ধরে নিজের চেনা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না, যা দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে শেষ তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে তিনি চরম হতাশাজনক পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন এবং তিন ম্যাচ মিলিয়ে মাত্র ৫৮ রান করতে সক্ষম হন। পাকিস্তানের ১-২ ব্যবধানে ঐতিহাসিক সিরিজ হারের পেছনে তার এই রান খরাকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে।
তবে শুধুমাত্র বাংলাদেশ সিরিজেই নয়, গত বছর অনুষ্ঠিত ২০২৫ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও তার ধীরগতির ব্যাটিং এবং রান না পাওয়ার প্রবণতা চোখে পড়েছে। এরপর নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও ওয়ানডে ক্রিকেটে তাকে অত্যন্ত অসহায় দেখিয়েছে। যদিও গত বছরের নভেম্বরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত সিরিজে কিছুটা রান পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী ফর্মকে তিনি পরবর্তীতে আর ধরে রাখতে পারেননি। ইতিমধ্যেই টি-টোয়েন্টি দল থেকে স্থায়ীভাবে বাদ পড়েছেন রিজওয়ান। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে তাকে আর দেশের হয়ে কুড়ি ওভারের আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলতে দেখা যায়নি। এবার ওয়ানডে দল থেকেও তার বাদ পড়ার বা ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে, যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
বাদ নাকি বিশ্রাম? পিসিবির দ্বিধা
রিজওয়ানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার খবরটি নিয়ে এখনো অফিসিয়ালি কোনো ঘোষণা না আসলেও ক্রিকেট মহলে এটি নিয়ে ব্যাপক শোরগোল চলছে। অনেকে মনে করছেন, এটি কি সত্যিই তার খারাপ ফর্মের জন্য বোর্ডের কোনো কঠোর ‘শাস্তি’, নাকি দীর্ঘ ও অত্যন্ত ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি এবং পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে টানা খেলার ধকল সামলাতে তাকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়ার কৌশল পিসিবির? তবে ভেতরের খবর হলো, টিম ম্যানেজমেন্ট এবং নির্বাচক কমিটি তার সাম্প্রতিক ব্যাটিং অ্যাপ্রোচে একদমই সন্তুষ্ট নন। তাই কেবল বিশ্রামের অজুহাত দিয়ে নয়, পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই তাকে দলের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। রিজওয়ানের বিকল্প হিসেবে পিসিবি উসমান খান বা তরুণ প্রতিভাবান সাদ বেগের মতো নতুন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানদের দিকে নজর দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই তরুণদের সুযোগ দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সামর্থ্য যাচাই করতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট।
বড় ধাক্কা: ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন ফখর জামান ও সাইম আইয়ুব
রিজওয়ানের বাদ পড়ার গুঞ্জনের মধ্যেই পাকিস্তান শিবিরের জন্য এসেছে আরও কিছু দুঃসংবাদ। চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটকে গেছেন দলের দুই তারকা ওপেনার ফখর জামান ও সাইম আইয়ুব। পিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই দুই ক্রিকেটার বর্তমানে বোর্ডের মেডিকেল প্যানেলের অধীনে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ফখর জামানের অনুপস্থিতি পাকিস্তান দলের জন্য একটি বিশাল ধাক্কা হতে যাচ্ছে। কারণ, সদ্য সমাপ্ত পিএসএল ২০২৬ মৌসুমে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন এই বাঁহাতি ওপেনার। তার আগ্রাসী ব্যাটিং দলের জয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারত। অন্যদিকে, তরুণ সাইম আইয়ুবের ছিটকে যাওয়াও দলের ওপেনিং কম্বিনেশনকে দুর্বল করে তুলবে, যা টিম ম্যানেজমেন্টকে নতুন ওপেনিং জুটি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।
অস্ট্রেলিয়া দলের পাকিস্তান সফর ও সময়সূচি
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আগামী ২৩ মে, শনিবার পাকিস্তানে পা রাখবে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। দুই দলের মধ্যে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজটি অনুষ্ঠিত হবে ৩০ মে থেকে ৪ জুনের মধ্যে। সিরিজের ম্যাচগুলো রাওয়ালপিন্ডি এবং লাহোরের স্টেডিয়ামগুলোতে খেলা হবে। এই সিরিজটি উভয় দলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০২৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আইসিসি পুরুষ ক্রিকেট বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই দ্বিপাক্ষিক সিরিজটিকে দেখছে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড। নিজেদের কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়াকে মোকাবিলা করা পাকিস্তানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, বিশেষ করে যখন দলে একাধিক নিয়মিত ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড় অনুপস্থিত থাকবেন।
পিসিবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নতুন মুখের সন্ধান
মোহাম্মদ রিজওয়ানের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে বাইরে রেখে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি পিসিবির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। ২০২৭ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দল গোছানোর কাজ এখনই শুরু করতে চায় তারা। উসমান খান ও সাদ বেগের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা কতটা, তা অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা যাবে। তবে অভিজ্ঞ রিজওয়ানকে পুরোপুরি বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া সহজ হবে না। দলের কঠিন মুহূর্তে তার অভিজ্ঞতা ও উইকেটের পেছনে তার নির্ভরযোগ্যতা সবসময়ই পাকিস্তানের জন্য সম্পদ ছিল। এখন দেখার বিষয়, পিসিবি সত্যিই কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নাকি রিজওয়ানকে আরও একটি সুযোগ দেওয়া হয়।
