Cricket News

আইসিসি-র বড় পরিবর্তন: একই টেস্টে গোলাপি ও লাল বল, কোচদের মাঠে প্রবেশ ও টি-টোয়েন্টি বিরতি হ্রাস

Farhan Malik · · 1 min read

ক্রিকেট বিশ্বের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) খেলার নিয়মে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের কথা ভাবছে, যা এই খেলার ভবিষ্যৎকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে। লাল বল, সাদা বল এবং গোলাপি বলের ক্রিকেটে প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে টি-টোয়েন্টি ইনিংসের বিরতি কমানো, বলের রঙ সংক্রান্ত নীতি এবং ড্রিংকস ব্রেকের সময় প্রধান কোচের মাঠে প্রবেশাধিকার। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি হলো একই টেস্ট ম্যাচে লাল বল থেকে গোলাপি বলে খেলার প্রস্তাব।

একই টেস্টে লাল ও গোলাপি বলের ব্যবহার: এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন

টেস্ট ক্রিকেটের জন্মলগ্ন থেকেই লাল বলের ব্যবহার একটি চিরাচরিত প্রথা। এই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে একই টেস্ট ম্যাচে লাল বল থেকে গোলাপি বলে খেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি বড় মোড় হতে চলেছে। আইসিসি বর্তমানে এই বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করছে, যা ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেটের সঙ্গে একটি বড় ধরনের বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।

আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহের নেতৃত্বাধীন বোর্ড একই টেস্ট ম্যাচে ভিন্ন রঙের বল ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এর মানে হল, একটি প্রচলিত টেস্ট ম্যাচে লাল বল থেকে গোলাপি বলে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ক্রিকবাজের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান প্রস্তাবিত শর্তে, যদি আবহাওয়ার ব্যাঘাতের কারণে বা আলোর স্বল্পতার কারণে খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হয় এবং যদি উভয় দলই সম্মত হয়, তাহলে তারা দিনের আলোতে লাল বলের পরিবর্তে ফ্লাডলাইটের নিচে গোলাপি বল ব্যবহার করার অনুমতি পেতে পারে। যদিও এই পরিবর্তনের বিস্তারিত দিকগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে একটি টেস্ট ম্যাচের মাঝখানে লাল বল থেকে গোলাপি বলে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণ করা বেশ জটিল হবে।

লাল বল থেকে গোলাপি বলে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কেমন হতে পারে?

প্রতিবেদন অনুসারে, বল পরিবর্তনের জন্য উভয় দলের ‘পারস্পরিক সম্মতি’ অত্যন্ত জরুরি। এমনকি একটি দল যদি অসম্মত হয়, তবে খারাপ আলো বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বোলিং দল গোলাপি বল ব্যবহার করতে পারবে না। এই বিশাল পরিবর্তনের আরও বিস্তারিত তথ্য সম্ভবত তখনই স্পষ্ট হবে যখন সংশোধনীটি অনুমোদিত হবে অথবা আইসিসি নিজেই একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে।

গত বৃহস্পতিবার ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত আইসিসি চিফ এক্সিকিউটিভস কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বৈঠকে আইসিসি ক্রিকেট কমিটির প্রধান সৌরভ গাঙ্গুলিও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই আলোচনার ফল সম্ভবত ৩০শে মে আহমেদাবাদে আইসিসি বোর্ডের আরেকটি বৈঠকে প্রকাশ করা হবে।

আইসিসি কীভাবে তার নিয়মাবলী ও খেলার শর্তাদি সংশোধন করে?

যারা জানেন না তাদের জন্য, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল তার নিয়মাবলী, যা আনুষ্ঠানিকভাবে খেলার শর্তাদি (Playing Conditions) নামে পরিচিত, একটি সুসংগঠিত এবং বহু-স্তরীয় কমিটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশোধন করে। এই প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করে যে প্রতিটি পরিবর্তন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয় এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে গভীর বিবেচনা করা হয়।

  • ক্রিকেট কমিটি: এই কমিটি প্রাক্তন ক্রিকেটার, আম্পায়ার এবং কোচদের নিয়ে গঠিত। তাদের প্রধান কাজ হলো খেলার মধ্যে থাকা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধানের জন্য প্রস্তাবনা তৈরি করা। খেলার প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত দিকগুলো সম্পর্কে তাদের গভীর জ্ঞান থাকার কারণে, এই কমিটি বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর পরিবর্তন নিয়ে কাজ করে।
  • চিফ এক্সিকিউটিভস কমিটি (সিইসি): ক্রিকেট কমিটি দ্বারা তৈরি প্রস্তাবনাগুলো এরপর চিফ এক্সিকিউটিভস কমিটির কাছে পাঠানো হয়। এটি পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর প্রধান নির্বাহীদের নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা। এই কমিটি প্রস্তাবগুলোর কার্যকারিতা, ন্যায্যতা এবং বিশ্বব্যাপী ক্রিকেটের উপর তাদের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিতর্ক করে। চূড়ান্তভাবে, তারা প্রস্তাবগুলো অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার জন্য ভোট দেয়।
  • আইসিসি বোর্ড অফ ডিরেক্টরস: সিইসি-র সুপারিশগুলো এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আইসিসি বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের কাছে উপস্থাপন করা হয়। পূর্ণ সদস্য দেশ এবং সহযোগী সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৈঠকের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই বোর্ডই চূড়ান্তভাবে নিয়মগুলোকে স্বাক্ষর করে বা প্রত্যাখ্যান করে।

গুরুত্বপূর্ণভাবে, একটি নিয়ম অনুমোদিত হওয়ার পর বা খেলার শর্তাদি পরিবর্তিত হওয়ার পর, আইসিসি নতুন নিয়মগুলো কার্যকর করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে। সাধারণত, নতুন নিয়মগুলো একটি নতুন দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বা একটি বড় আইসিসি টুর্নামেন্টের শুরুতে কার্যকর করা হয়। এটি নিশ্চিত করে যে দলগুলো নতুন নিয়মগুলির সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়।

ড্রিংকস ব্রেকের সময় প্রধান কোচদের মাঠে প্রবেশাধিকার

বলের পরিবর্তন ছাড়াও, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোতে ড্রিংকস ব্রেকের সময় প্রধান কোচকে মাঠে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই নিয়মটি মূলত ওয়ানডে ক্রিকেটে দেখা যাবে, যেখানে বর্তমানে শুধুমাত্র বদলি খেলোয়াড়দেরই মাঠে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে কোচরা খেলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সরাসরি খেলোয়াড়দের সাথে কৌশলগত আলোচনা করতে পারবেন, যা ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। যদিও কোচকে দলের জার্সি পরতে হবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রতি ইনিংসে দুটি ড্রিংকস ব্রেক অনুমোদিত, যা সাধারণত এক ঘন্টা দশ মিনিট অন্তর নেওয়া হয়। এই সময়টুকু কোচদের জন্য খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করা এবং পরবর্তী পরিকল্পনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার একটি মূল্যবান সুযোগ তৈরি করবে।

টি-টোয়েন্টি ইনিংসের বিরতির সময় হ্রাস

আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে ইনিংসের বিরতির সময় কমানোর প্রস্তাব। বিদ্যমান খেলার শর্ত অনুযায়ী, ইনিংসের মাঝে ২০ মিনিটের বিরতি থাকে, যা বিরতির আগে খেলার শেষ হওয়ার সময় থেকে বিরতির পর খেলা শুরু হওয়ার সময় পর্যন্ত ধরা হয়। তবে, আইসিসি এখন দলগুলোকে মাত্র ১৫ মিনিটের বিরতির পর মাঠে ফিরে আসার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এই পরিবর্তনটি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দ্রুত গতি এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দর্শকদের জন্য খেলাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। কম বিরতির ফলে খেলার সামগ্রিক সময়ও কমে আসবে, যা সম্প্রচারকদের জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে।

উপসংহার

আইসিসি-র এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো নিঃসন্দেহে আধুনিক ক্রিকেটের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই টেস্ট ম্যাচে লাল ও গোলাপি বলের ব্যবহার, কোচদের মাঠে প্রবেশাধিকার এবং টি-টোয়েন্টিতে সংক্ষিপ্ত বিরতি – এই সবই খেলার কৌশল, গতি এবং দর্শক অভিজ্ঞতায় বড় প্রভাব ফেলবে। আহমেদাবাদে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী বৈঠকে এই প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যা বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Avatar photo
Farhan Malik

Farhan Malik writes tactical T20 cricket analysis with a focus on momentum shifts, batting strategies, and death-over performance.