আফগানিস্তান সিরিজের আগে গৌতম গম্ভীরের বড় পদক্ষেপ: WTC ফাইনালে যেতে মরিয়া ভারত
ভূমিকা: ডব্লিউটিসি ফাইনালের সমীকরণে ব্যাকফুটে ভারত
সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভারত একের পর এক সাফল্য পেলেও, টেস্ট ফরম্যাটে লাল বলের কোচ হিসেবে গৌতম গম্ভীরের যাত্রা একেবারেই মসৃণ হয়নি। ঘরের মাঠে সাম্প্রতিক টেস্ট সিরিজগুলোতে অত্যন্ত হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (WTC) ফাইনালে খেলার স্বপ্ন এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে লজ্জাজনক হোয়াইটওয়াশ ভারতীয় ক্রিকেট দলের ডব্লিউটিসি অভিযানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার আশা বাঁচিয়ে রাখতে এবার এক যুগান্তকারী ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে গৌতম গম্ভীরের নেতৃত্বাধীন টিম ম্যানেজমেন্ট।
বাংলাদেশের কাছে স্থানচ্যুতি: পয়েন্ট টেবিলে কঠিন সমীকরণ
নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল সম্প্রতি ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে দুর্দান্ত এক ক্লিন সুইপ অর্জন করেছে। টাইগারদের এই ঐতিহাসিক জয় তাদের পয়েন্ট পার্সেন্টেজ (PCT) অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে তারা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে শুভমান গিলের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলকে টপকে যেতে সক্ষম হয়েছে।
এই চক্রে ভারতের হাতে আর মাত্র নয়টি টেস্ট ম্যাচ বাকি রয়েছে। ফলে, ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভারতের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে। ভারতকে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদেরই মাটিতে দুটি করে টেস্ট খেলতে হবে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বাকি ম্যাচগুলোর মধ্যে পাঁচটি ম্যাচ ভারত খেলবে নিজেদের চেনা পরিবেশে। তাই আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হতে চলা বহুল প্রতীক্ষিত বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে ঘরের মাঠের পূর্ণ সুবিধা নিতে মরিয়া শুভমান গিল এবং তার সতির্থরা।
ঘরের মাঠের সুবিধা হাতছাড়া: ভারতের ডব্লিউটিসি বিপর্যয়ের প্রধান কারণ
ভারতীয় টেস্ট দলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, ঘরের মাঠের পিচ ও কন্ডিশনের সুবিধা সঠিকভাবে নিতে না পারাই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গৌতম গম্ভীরের কোচিং মেয়াদে ঘরের মাঠে খেলা শেষ সাতটি টেস্টের মধ্যে পাঁচটিতেই হারতে হয়েছে ভারতকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৭ ডব্লিউটিসি সংস্করণে নিজেদের মাটিতে চারটি টেস্ট খেলার পর ভারতের সাফল্যের হার মাত্র ৫০ শতাংশ, যা ভারতের মতো শক্তিশালী দলের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
ভারতের ঐতিহ্যবাহী স্পিন-সহায়ক ট্র্যাকে প্রতিপক্ষের বোলারদের সামনে পুরোপুরি খেই হারিয়ে ফেলেছেন ভারতীয় ব্যাটাররাই। মিচেল স্যান্টনার এবং সাইমন হারমারের মতো প্রতিপক্ষ স্পিনাররা ভারতীয় ব্যাটারদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ভারতের দুর্গে হানা দিয়েছেন এবং তাদের মাটিতেই ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের ইতিহাস লিখেছেন। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, টিম ম্যানেজমেন্ট এবার পিচ কিউরেটরদের কাছে এমন পিচ তৈরির দাবি জানিয়েছে যা ম্যাচের প্রথম দিন থেকেই ভেঙে যাবে না, বরং ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।
লাল মাটির পিচ বর্জন: কালো মাটিতে ভরসা রাখছে টিম ম্যানেজমেন্ট
স্পিন ট্র্যাকে ভারতীয় দলের শোচনীয় পরাজয়ের কথা মাথায় রেখে গৌতম গম্ভীরের নেতৃত্বাধীন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লাল মাটির পিচ এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসন্ন হোম টেস্ট ম্যাচগুলোতে লাল মাটির পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে বেশি কালো মাটি সমৃদ্ধ পিচ প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
লাল মাটির পিচগুলো সাধারণত ম্যাচের প্রথম দিন থেকেই ভাঙতে শুরু করে এবং অতিরিক্ত স্পিন তৈরি করে, যা ভারতের নিজেদের ব্যাটারদের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, কালো মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা অনেক বেশি। এর ফলে কালো মাটির তৈরি উইকেট দীর্ঘ সময় পর্যন্ত টিকে থাকে এবং ম্যাচের প্রথম দিনেই স্পিনাররা অতিরিক্ত সুবিধা পান না। এই ধরনের উইকেটে খেলা চতুর্থ বা পঞ্চম দিন পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা থাকে, যা ব্যাটারদের থিতু হতে সাহায্য করবে এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ উপহার দেবে।
ভবিষ্যৎ টেস্টের জন্য ভেন্যু নির্বাচন ও রণকৌশল
আগামী টেস্ট ম্যাচগুলোর জন্য ভেন্যু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে বিসিসিআই। পিচের প্রকৃতি, মাটির ধরন এবং সার্বিক কন্ডিশন বিবেচনা করেই ভেন্যুগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিসিসিআই-এর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন:
“মুল্লানপুর, নাগপুর, চেন্নাই, গুয়াহাটি, রাঁচি এবং আহমেদাবাদকে ভারতের পরবর্তী ছয়টি হোম টেস্টের জন্য ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এই ভেন্যুগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচন করা হয়েছে যাতে পিচ, মাটি ও আবহাওয়ার কন্ডিশন আমাদের অনুকূলে থাকে।”
তিনি আরও যোগ করেন:
“এই ভেন্যুগুলোর বেশিরভাগই লাল, কালো এবং মিশ্র মাটির পিচ তৈরির সুবিধা প্রদান করে। তবে এবার এমন পিচ তৈরি করার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে যা অন্তত পাঁচ দিন স্থায়ী হবে। আমাদের ব্যাটাররা প্রথম দিন থেকেই অতিরিক্ত টার্ন নেওয়া উইকেটে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। তাছাড়া, আড়াই বা তিন দিনে ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়া সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলোর জন্যও বড়সড় ব্যবসায়িক ক্ষতি।”
উপসংহার: গম্ভীরের নতুন চাল কি ফেরাবে ভারতের ভাগ্য?
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্ট এবং বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে কালো মাটির ঐতিহ্যবাহী পিচ ব্যবহার করার এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এর ফলে ভারতীয় ব্যাটাররা উইকেটে থিতু হওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বোলাররাও তাদের দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন। ডব্লিউটিসি ফাইনালের দৌড়ে টিকে থাকতে হলে ভারতকে ঘরের মাঠে জয়ের ধারা ফিরিয়ে আনতেই হবে। এখন দেখার বিষয়, গৌতম গম্ভীরের এই সাহসী এবং কৌশলগত পরিবর্তন ভারতীয় ক্রিকেট দলকে আবার সাফল্যের চূড়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে কিনা।
