নির্বাসিত আফগান নারী ক্রিকেটারদের ইংল্যান্ড সফর: এক অদম্য লড়াইয়ের গল্প
আফগান নারী ক্রিকেটের অদম্য যাত্রা: ইংল্যান্ডে নতুন আশার আলো
২০২১ সালে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশটির নারী ক্রীড়াঙ্গনে নেমে আসে অন্ধকার। বিশেষ করে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর নারীদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিও দমাতে পারেনি একদল সাহসী নারী ক্রিকেটারকে। এখন তারা নির্বাসিত জীবন থেকেই ক্রিকেটের মূল স্রোতধারায় ফেরার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ধারাবাহিকতায় আগামী ২২ জুন থেকে তারা শুরু করতে যাচ্ছেন এক বিশেষ ইংল্যান্ড সফর।
সফরের প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি
আফগান শরণার্থী নারী ক্রিকেট দলের এই সফরটি আয়োজন করছে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ECB)। পাশাপাশি এমসিসি (MCC), এমসিসি ফাউন্ডেশন এবং স্পোর্টস কনসালটেন্সি ‘ইটস গেম অন’ এই উদ্যোগে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া এবং টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার মাধ্যমে তাদের দক্ষতা ও সংহতি বৃদ্ধি করা।
খেলোয়াড়রা এই সফরের শেষ পর্যায়ে লর্ডসে অনুষ্ঠিতব্য নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এটি তাদের বিশ্ব ক্রিকেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
পটভূমি: ট্রায়াল থেকে নির্বাসন
২০২০ সালের নভেম্বরে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড কাবুলে নারীদের জন্য ক্রিকেটের ট্রায়াল আয়োজন করেছিল এবং ২৫ জন নারী খেলোয়াড়কে চুক্তিবদ্ধ করেছিল। কিন্তু ৯ মাস পেরোতেই সব ওলটপালট হয়ে যায়। তালেবানদের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা তাদের স্বপ্ন থেকে ছিটকে পড়েন। যদিও তাদের আইসিসি স্বীকৃত দল হিসেবে অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা এখনো সফল হয়নি, তবে তারা থেমে থাকেননি। অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রিত এই নারী ক্রিকেটাররা ‘আফগানিস্তান রিফিউজি একাদশ’ নামে বিভিন্ন প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নিয়েছেন। এর আগে ভারতের ওয়ানডে বিশ্বকাপে তারা দর্শক হিসেবে উপস্থিত হয়ে ক্রিকেটের প্রতি নিজেদের অটুট ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছিলেন।
ক্রিকেট বিশ্বের সমর্থন ও মেল জোন্সের বক্তব্য
অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন খেলোয়াড় মেল জোন্স, যিনি ‘ইটস গেম অন’ সংস্থার অন্যতম উদ্যোক্তা, এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘এই খেলোয়াড়রা সবকিছু হারানোর পরেও ক্রিকেটের প্রতি যে সাহস ও প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। তাদের বিশ্ব ক্রিকেট সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। তবে শুধু এই একটি সফর নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার জন্য আরও বড় পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
ইসিবি-র অবস্থান
ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের উপ-প্রধান নির্বাহী ক্লেয়ার কনর এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর থেকে এই খেলোয়াড়রা অবিশ্বাস্য সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। ক্রিকেট খেলাটি অন্তর্ভুক্তির প্রতীক, আর সেই দায়িত্ব থেকেই আমরা এই সফর আয়োজন করে তাদের সমর্থন দিতে পেরে গর্বিত।’
ভবিষ্যতের পথচলা
এই সফর শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নারী অধিকারের একটি প্রতীক। যদিও তারা নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারছেন না, তবুও এই নির্বাসিত নারী ক্রিকেটাররা প্রমাণ করছেন যে, প্রতিকূলতা যত গভীরই হোক, স্বপ্ন জয় করা সম্ভব। ক্রিকেট বিশ্ব তাদের এই প্রচেষ্টাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং আগামী দিনে তাদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তাদের এই লড়াই বিশ্বজুড়ে হাজারো প্রান্তিক খেলোয়াড়ের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পরিশেষে, এই সফরটি বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে তাদের পলিসি পুনর্বিবেচনার বার্তা দেয়। খেলাধুলা কোনো নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে লড়াই করে যাচ্ছেন।
