২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: রোহিত শর্মা না খেললে ভারতের ৩টি সম্ভাব্য ওপেনিং জুটি
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি এবং রোহিত শর্মার বিকল্প খোঁজার প্রয়োজনীয়তা
২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। এই মুহূর্তে টিম ম্যানেজমেন্ট ও নির্বাচকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হলো দলের ওপেনিং কম্বিনেশন বা উদ্বোধনী জুটি। যদিও আসন্ন আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের জন্য অভিজ্ঞ খেলোয়াড় রোহিত শর্মাকে দলে রাখা হয়েছে, তবুও তাঁর ফিটনেস এবং দীর্ঘ মেয়াদে খেলার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নগুলো ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে ৩৯ বছর বয়সী রোহিত শর্মার জন্য কাজের চাপ (Workload) সামলানো এবং দীর্ঘ কোনো টুর্নামেন্টে সম্পূর্ণ ফিট থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই কারণেই নির্বাচকরা ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিকল্প ওপেনিং জুটিগুলো যাচাই করছেন।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি কোনো কারণে ২০২৭ সালের বিশ্বকাপে রোহিত শর্মা খেলতে না পারেন, তবে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট বেশ কয়েকটি বিকল্প ওপেনিং কম্বিনেশন বিবেচনায় রাখছে। যেহেতু এই মেগা ইভেন্টের আগে ভারতের খুব বেশি ওয়ানডে ম্যাচ খেলার সুযোগ নেই, তাই প্রতিটি ম্যাচ এবং প্রতিটি সুযোগই চূড়ান্ত স্কোয়াড নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রোহিত শর্মা ২০২৭ বিশ্বকাপে না খেললে ভারতের সম্ভাব্য ৩টি ওপেনিং কম্বিনেশন
১. ঈশান কিষাণ এবং শুভমান গিল (Ishan Kishan and Shubman Gill)
রোহিত শর্মার অনুপস্থিতিতে ভারতের জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং কার্যকর ওপেনিং জুটি হতে পারে ঈশান কিষাণ এবং শুভমান গিল-এর সংমিশ্রণ। এই দুই ব্যাটারের মধ্যে মাঠের ভেতরে চমৎকার বোঝাপড়া রয়েছে। তাছাড়া, তাদের বাম-হাতি এবং ডান-হাতি (Left-Right Combination) ব্যাটিং জুটি দলের ইনিংসে দারুণ ভারসাম্য এনে দিতে পারে।
২০২৩ সালের পর থেকে ওয়ানডে ফরম্যাট থেকে দূরে থাকার পর, ঈশান কিষাণ ভারতের ওয়ানডে পরিকল্পনায় বেশ জোরালোভাবে ফিরে এসেছেন। সম্প্রতি তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত নজরকাড়া। আইপিএল ২০২৬ (IPL 2026)-এ এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ১৩টি ইনিংসে ৪৯০ রান সংগ্রহ করেন, যেখানে তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল মারকুটে মনোভাব। এছাড়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ঈশান দুর্দান্ত খেলেন, ৯টি ম্যাচে ১৯৩.২৯ এর স্ট্রাইক রেটে ৩১৭ রান করে টুর্নামেন্টের চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন।
শুধু আন্তর্জাতিক বা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেই নয়, ঘরোয়া ক্রিকেটেও ঈশান কিষাণ নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছেন। সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি (SMAT 2025)-এ তিনি ১০টি ইনিংসে প্রায় ২০০ স্ট্রাইক রেটে ৫১৭ রান করেন। এর পাশাপাশি বিজয় হাজারে ট্রফি (VHT 2025-26)-তে মাত্র ৩টি ইনিংসে ২৩১-এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ১৫৫ রান করে সবাইকে চমকে দেন। ওয়ানডে ক্রিকেটেও তাঁর পরিসংখ্যান বেশ শক্তিশালী; এখন পর্যন্ত ২৭টি ওয়ানডে ম্যাচে ৪২.৪০ গড়ে তিনি ৯৩৩ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ১টি সেঞ্চুরি এবং ৭টি হাফ সেঞ্চুরি।
অন্যদিকে, শুভমান গিল ইতিমধ্যেই নিজেকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী ওপেনিং স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অতএব, গিলের মতো একজন নির্ভরযোগ্য ব্যাটারের সাথে ঈশানের মতো আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে যুক্ত করলে ভারত এক নিখুঁত ও ভারসাম্যপূর্ণ শুরু পেতে পারে। এই জুটি অতীতেও সফল হয়েছে। ২০২৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাদের ১৪৩ রানের উদ্বোধনী জুটিটি ছিল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে যেকোনো ভারতীয় জুটির সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। সামগ্রিকভাবে, তারা একসঙ্গে ১৩টি ইনিংসে ৫৯২ রান সংগ্রহ করেছেন।
২. শুভমান গিল এবং রুতুরাজ গায়কোয়াড় (Shubman Gill and Ruturaj Gaikwad)
রোহিত শর্মার অনুপস্থিতিতে ভারতের জন্য আরেকটি দারুণ বিকল্প হতে পারে শুভমান গিল এবং রুতুরাজ গায়কোয়াড়-এর জুটি। যদিও আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে গায়কোয়াড়কে দলে রাখা হয়নি, তবুও ভবিষ্যতের ওয়ানডে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি নির্বাচকদের নজরে বেশ ভালোভাবেই আছেন।
রুতুরাজ গায়কোয়াড় মূলত তাঁর দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিং শৈলী এবং চাপের মুখে ইনিংস গড়ার দক্ষতার জন্য পরিচিত। আক্রমণাত্মক হিটারদের মতো ঝুঁকি না নিয়ে, তিনি টাইমিং এবং প্লেসমেন্টের ওপর বেশি জোর দেন, যা ওয়ানডে ক্রিকেটে লম্বা ইনিংস খেলতে সাহায্য করে। তাই গিলের সাথে তাঁর জুটি ভারতকে একটি কারিগরিভাবে বা টেকনিক্যালি অত্যন্ত শক্তিশালী ওপেনিং জুটি উপহার দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে গায়কোয়াড় ইতিমধ্যে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। মাত্র ৮টি ওয়ানডে ইনিংসে তিনি ২২৮ রান করেছেন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ওয়ানডেতে তাঁর অন্যতম সেরা পারফরম্যান্সটি আসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে, যেখানে তিনি ৮৩ বলে ১০৫ রানের এক চমৎকার ইনিংস খেলেন।
ঘরোয়া ক্রিকেটেও তাঁর ব্যাট সমানে কথা বলেছে। বিজয় হাজারে ট্রফি ২০২৫-২৬ (Vijay Hazare Trophy 2025-26)-এ তিনি ৭টি ইনিংসে ১১৫.০৪ স্ট্রাইক রেটে ৪১২ রান করেন, যার মধ্যে ছিল ২টি দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। এই ধরণের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ওয়ানডে দলে তাঁর দাবিকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। গিল এবং রুতুরাজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওপেনিং জুটি হিসেবে ৩টি ম্যাচে ১৬৯ রান করেছেন। যদিও এই সংখ্যাটি খুব বড় নয়, তবে তাদের পারফরম্যান্স অত্যন্ত ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
৩. শুভমান গিল এবং যশস্বী জয়সওয়াল (Shubman Gill and Yashasvi Jaiswal)
শুভমান গিল এবং যশস্বী জয়সওয়াল-এর জুটিটি হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য ভারতের প্রথম পছন্দের ওপেনিং কম্বিনেশন। এই দুই খেলোয়াড়ই তরুণ, নির্ভীক এবং টেকনিক্যালি অত্যন্ত প্রতিভাবান। অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই জুটি আগামী বহু বছর বিশ্ব ক্রিকেটে দাপট দেখাতে পারে。
যদিও যশস্বী জয়সওয়াল এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি ওয়ানডে ইনিংস খেলেছেন, তবে তাতেই তিনি নিজের অসীম সম্ভাবনার জানান দিয়েছেন। নিজের ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১২১ বলে ১১৬ রানের এক অনবদ্য অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি।
বর্তমানে তিন ফরম্যাটেই দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন এই তরুণ বাঁহাতি ব্যাটার। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে সুযোগ না পেলেও, ২০২৭ সালের বিশ্বকাপের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় জয়সওয়াল অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবেই থাকবেন। তাঁর আক্রমণাত্মক ও আগ্রাসী খেলার ধরণ গিলের শান্ত ও সংযত ব্যাটিং শৈলীকে নিখুঁতভাবে পরিপূরক করে তুলবে। এর ফলে পাওয়ারপ্লেতে যেমন ভারত দ্রুত রান তুলতে পারবে, তেমনি যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিও তারা সহজে সামাল দিতে পারবে।
উপসংহার
রোহিত শর্মার ফিটনেস এবং ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে এসে টিম ইন্ডিয়ার জন্য নতুন ওপেনিং কম্বিনেশন খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। শুভমান গিলের সাথে ঈশান কিষাণ, রুতুরাজ গায়কোয়াড় বা যশস্বী জয়সওয়ালের মতো দারুণ সব বিকল্প ভারতের হাতে রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে টিম ম্যানেজমেন্ট কোন কম্বিনেশনের ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে। প্রতিটি সুযোগই এই তরুণ তুর্কীদের জন্য নিজেদের প্রমাণ করার এবং বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার হতে চলেছে।
