বিরাট কোহলির ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে রাহুল দ্রাবিড়ের বিশেষ অবদান
বিরাট কোহলির জীবনের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ালেন রাহুল দ্রাবিড়
ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক বিরাট কোহলি সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত আরসিবি ইনোভেশন ল্যাব ইন্ডিয়ান স্পোর্টস সামিটে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তার ক্যারিয়ারের সেই অধ্যায়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা ছিল তার জন্য মানসিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে টেস্ট দলের অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেওয়ার পরবর্তী সময়টা ছিল তার জন্য এক গভীর পরিবর্তনের কাল।
অধিনায়কত্ব ছাড়ার পেছনের গল্প
বিরাট কোহলি ২০২১ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এরপর বিসিসিআই নির্বাচকরা রোহিত শর্মাকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটের অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং কোহলি শুধু টেস্ট দলের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তবে ২০২২ সালের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ হারের পর তিনি টেস্ট অধিনায়কত্ব থেকেও পদত্যাগ করেন। এটি ছিল এমন একটি সময়, যখন বিরাট কোহলি ব্যাট হাতে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। টানা তিন বছরেরও বেশি সময় তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো সেঞ্চুরির দেখা পাননি।
রাহুল দ্রাবিড় ও বিক্রম রাঠৌরের ভূমিকা
এই কঠিন সময়ে ভারতীয় দলের তৎকালীন প্রধান কোচ রাহুল দ্রাবিড় এবং ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠৌর যেভাবে তাকে সহায়তা করেছেন, তার জন্য কোহলি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কোহলি বলেন, ‘আমি যখনই রাহুল দ্রাবিড় এবং বিক্রম রাঠৌরের সাথে দেখা করেছি, তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছি। তারা আমার খুব যত্ন নিয়েছিলেন, যা আমাকে মাঠে ভালো পারফর্ম করার সুযোগ করে দিয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের এই যত্ন এবং নির্দেশনা আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে আমি অতীতে কী করেছি। একজন খেলোয়াড় হিসেবে মাঝে মাঝে আমরা নিজের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে বাইরের বিষয়গুলো খেয়াল করি না। যেহেতু দ্রাবিড় এবং রাঠৌর দুজনেই ভারতের হয়ে খেলেছেন, তাই তারা আমার মানসিক অবস্থা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের সেই দিকনির্দেশনা আমাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করেছিল এবং ক্রিকেটকে উপভোগ করার মতো অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিল।’
নেতৃত্বের চাপ ও একাকীত্ব
এমএস ধোনির অবসরের পর পূর্ণকালীন টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বিরাট কোহলি। ৬৮টি টেস্ট ম্যাচে ৪০টি জয় নিয়ে তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়াটা অনেক সমর্থকের কাছে ছিল বড় এক ধাক্কা।
ইভেন্টে কথা বলার সময় কোহলি নেতৃত্বের পেছনের চ্যালেঞ্জগুলোও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অধিনায়কত্ব দেওয়া হয় নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য। একজন লিডারের দায়িত্ব হলো পুরো দলকে পরিচালনা করা এবং প্রয়োজনে কোচিংয়ের ভূমিকা পালন করা। আপনার সাথে যারা খেলছেন, তাদের প্রতি মনোযোগ দিতে গিয়ে অনেক সময় নিজের কথা ভুলে যেতে হয়। মজার ব্যাপার হলো, আমার অধিনায়কত্বের পুরো সময়টাতে কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি যে, আমি কেমন আছি বা আমার মানসিক অবস্থা কেমন।’
ক্রিকেটে ফেরার লড়াই
বিরাট কোহলির এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, একজন তারকা খেলোয়াড়ের সাফল্যের আড়ালেও অনেক সময় লুকিয়ে থাকে একাকীত্বের দীর্ঘ গল্প। রাহুল দ্রাবিড় ও বিক্রম রাঠৌরের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সান্নিধ্য তাকে সেই অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছে। বর্তমানে কোহলি যে ফর্মে আছেন, তাতে তাদের সেই অবদানের ছাপ স্পষ্ট। একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স যে কেবল শারীরিক দক্ষতার ওপর নয়, বরং মানসিক প্রশান্তির ওপরও নির্ভর করে, কোহলির এই ঘটনাটি তারই জ্বলন্ত উদাহরণ।
পরিশেষে, একজন প্রাক্তন অধিনায়কের এই অকপট স্বীকারোক্তি তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে—ক্রিকেটের মাঠে কেবল রান করাই শেষ কথা নয়, মানসিকভাবে সুস্থ থাকা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ পাওয়াটাও সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।
