মহম্মদ শামির যুগ কি শেষ? বিসিসিআইয়ের বড় সিদ্ধান্তে তোলপাড় ভারতীয় ক্রিকেট
মহম্মদ শামিকে ছাড়াই নতুন পরিকল্পনা বিসিসিআই-এর
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) সম্প্রতি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আসন্ন একটি টেস্ট এবং তিনটি ওয়ানডে ম্যাচের জন্য ভারতীয় দল ঘোষণা করেছে। আগামী ৬ জুন থেকে এই সিরিজ শুরু হতে চলেছে। ওয়ানডে ম্যাচগুলি অনুষ্ঠিত হবে ১৪, ১৭ এবং ২০ জুন। তবে এই দল ঘোষণার সবথেকে বড় চমক ছিল অভিজ্ঞ পেসার মহম্মদ শামির অনুপস্থিতি। টেস্ট এবং ওয়ানডে—উভয় ফরম্যাট থেকেই শামিকে বাদ রাখা হয়েছে, যা ভারতীয় ক্রিকেটে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচকদের এই সিদ্ধান্ত থেকে এটি পরিষ্কার যে, বোর্ড এখন শামির পরবর্তী প্রজন্মের পেসারদের গড়ে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী। যদিও শামি বছরের পর বছর ধরে ভারতের পেস অ্যাটাকের স্তম্ভ ছিলেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে যে তার দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্যারিয়ার সম্ভবত শেষের পথে।
মহম্মদ শামির বর্ণাঢ্য টেস্ট ক্যারিয়ারের এক ঝলক
উত্তরপ্রদেশের আমরোহার সন্তান মহম্মদ শামি ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে জাতীয় দলের নজরে আসেন। ২০১৩ সালে টেস্ট ক্রিকেটে তার অভিষেক হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে অপরিহার্য করে তোলেন। কলকাতা তথা নিজের ঘরের মাঠে অভিষেক টেস্টেই ৫ উইকেট নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি।
পরবর্তী এক দশকে শামি, ইশান্ত শর্মা, উমেশ যাদব এবং ভুবনেশ্বর কুমারের সাথে মিলে ভারতের একটি শক্তিশালী পেস ইউনিট গঠন করেছিলেন। ভারতের হয়ে ৬৪টি টেস্ট ম্যাচে শামি মোট ২২৯টি উইকেট শিকার করেছেন, যার গড় ২৭.৭১। তার সেরা বোলিং ফিগার ছিল ৫৬ রানে ৬ উইকেট। তিনি ২০২১ এবং ২০২৩ সালের আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ওভালের ডব্লিউটিসি ফাইনালই ছিল ভারতের জার্সিতে তার শেষ টেস্ট ম্যাচ।
নির্বাচকদের রাডারের বাইরে কেন শামি?
২০২৩ সালের আইসিসি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর শামি গোড়ালির চোটের কারণে লম্বা সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। সেই চোট সারিয়ে উঠতে তাকে অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজে তিনি মাঠে ফেরেন এবং একই বছর ভারতের সফল চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি অভিযানেও অংশ নেন।
তবে সেই টুর্নামেন্টের পর থেকে শামিকে আর জাতীয় দলের নীল জার্সিতে দেখা যায়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলার হয়ে ভালো পারফর্ম করা এবং আইপিএলের শেষ দুটি মরসুমে নজরকাড়া বোলিং করা সত্ত্বেও নির্বাচকরা তাকে আর জাতীয় দলে ফেরানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। অজিত আগরকরের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটি এখন তরুণ তুর্কিদের ওপর বেশি ভরসা রাখছে।
অজিত আগরকরের সাফ কথা: শামি কি এখন শুধু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার?
বিসিসিআই-এর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে শামিকে নিয়ে বোর্ডের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, শামির শারীরিক অবস্থা বর্তমানে শুধুমাত্র টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। আগরকর বলেন, “শামির টেস্টে ফেরা নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। আমাদের যা জানানো হয়েছে, সেই অনুযায়ী ওর শরীর এই মুহূর্তে ওকে লম্বা ফরম্যাটে খেলার অনুমতি দিচ্ছে না। আমি জানি ও এই বছর ঘরোয়া মরসুমে খেলেছে, কিন্তু আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী ও এখন মূলত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত। তাই ওকে নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা হয়নি।”
আগরকরের এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ভারতের ৫০ ওভারের ক্রিকেট বা টেস্ট ক্রিকেটে শামির ফেরার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ। নির্বাচকরা মনে করছেন, বয়সের ভার এবং চোটের প্রবণতা শামিকে লম্বা স্পেলে বোলিং করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নতুন পেস অ্যাটাকের দায়িত্ব মহম্মদ সিরাজের কাঁধে
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্ট ম্যাচটি হবে মুল্লানপুরের নিউ চণ্ডীগড় স্টেডিয়ামে। এটি ২০১৮ সালের পর ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে প্রথম টেস্ট লড়াই। এই ম্যাচে ভারতীয় পেস অ্যাটাককে নেতৃত্ব দেবেন মহম্মদ সিরাজ। শামির অনুপস্থিতিতে সিরাজ এখন ভারতের বোলিং আক্রমণের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন।
বিসিসিআই ঘোষিত স্কোয়াডে সিরাজের সাথে রয়েছেন প্রসিধ কৃষ্ণ। এছাড়া প্রথমবারের মতো টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন তরুণ পেসার গুরনুর সিং ব্রার। তাকে সাহায্য করার জন্য স্কোয়াডে রাখা হয়েছে অলরাউন্ডার নীতীশ কুমার রেড্ডিকে। এই নতুন সমন্বয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিসিসিআই এখন থেকেই ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য একটি শক্তিশালী তরুণ পেস ইউনিট তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছে।
উপসংহার: এক যুগের অবসান?
মহম্মদ শামির মতো একজন ম্যাচ উইনার পেসারকে ব্রাত্য রাখা ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য যেমন সাহসিকতার পরিচয়, তেমনি এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও। শামির অভিজ্ঞতা এবং পুরনো বলে রিভার্স সুইং করার ক্ষমতা ভারতের অনেক জয়ের নায়ক ছিল। তবে আগরকরের মন্তব্য এবং বর্তমান স্কোয়াড বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ভারতীয় ক্রিকেটে শামির লাল বলের অধ্যায় সম্ভবত শেষ হতে চলেছে। এখন দেখার বিষয়, সিরাজ এবং গুরনুররা শামির রেখে যাওয়া বিশাল জুতোয় পা গলাতে পারেন কি না।
