বাংলাদেশের জন্য একটি ক্রিকেট মিউজিয়াম: অপূর্ণ স্বপ্ন
আজ আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম দিবস। এই বছরের থিম, ”মিউজিয়াম: এক ভাগ হওয়া বিশ্বকে একসূত্রে গাঁথা”। এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ব যখন বিভক্তির গ্রাসে, মিউজিয়ামগুলো কেবল পুরনো জিনিসের আধার নয়—তারা ইতিহাস আর বর্তমানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সম্পর্ক জোড়া দেয়।
বাংলাদেশের হারানো স্মৃতি
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, সেনাবাহিনী ও মুদ্রা নিয়ে মিউজিয়াম আছে। কিন্তু যে ক্রিকেট ধর্ম, শ্রেণি, রাজনীতি সব ডিঙিয়ে দেশের মানুষকে এক করেছে, তার জন্য কোনো স্থায়ী স্পেস নেই। স্বাধীনতার পর থেকে ক্রিকেট আমাদের জীবনের এক অংশ হয়ে উঠেছে। হাসি, কান্না, গর্ব—প্রতিটি ম্যাচ আমাদের কাছে এক জাতীয় আবেগ। কিন্তু সেই আবেগের কোনো আধার নেই।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কোনো স্থায়ী সংগ্রহ বা আর্কাইভ নেই। আমি গত ২৫ বছর ধরে ক্রিকেটের স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ করছি। প্রতিদিনই আমি দেখি কীভাবে ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বে ক্রিকেট সংরক্ষণের রীতি
১৯৫৩ সালে মেরিলবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) লর্ডসে ক্রিকেট মিউজিয়াম চালু করে। তারপর থেকে প্রতিটি টেস্ট খেলোয়াড় জাতি তাদের ক্রীড়া ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ব্র্যাডম্যান মিউজিয়াম থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কায় সদ্য চালু হওয়া ক্রিকেট মিউজিয়াম—সবখানেই ক্রীড়াবীরদের সন্মান রক্ষা হয়।
ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাও উল্লেখযোগ্য। কলম্বোতে ক্রিকেট ক্লাব ক্যাফেতে গ্যারি সোবার্সের ১৯৬৮ সালের ছয়-ছয়ের ব্যাট, সচিন তেন্দুলকর ও ডন ব্র্যাডম্যানের সই করা জিনিস প্রদর্শিত হয়। দুবাইয়ে শম ভাতিয়ার মিউজিয়ামে আছে শাকিব আল হাসান-সহ সব ক্রিকেট তারকাদের জিনিস। কলকাতায় বোরিয়া মজুমদারের ফেনেটিক স্পোর্টস মিউজিয়ামে আছে ঐতিহাসিক চিঠি ও ম্যাচে পরা গিয়ার।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতি
এসব মিউজিয়ামে ঘুরে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি চোখে পড়ে। লর্ডসে আমাদের প্রথম টেস্টে অমিনুল ইসলাম বুলবুলের শতরানের ব্যাট ছাড়া আর কিছু নেই। নিউজিল্যান্ডে শাকিব ও মুশফিকুর রহিমের জুটির রেকর্ড বিদেশি দেয়ালে ঝুলছে। যে মুহূর্তগুলো লাখো মানুষকে উঠে দাঁড়া করালো, তা লন্ডন, উইলিংটন বা দুবাইয়ে রক্ষিত—ঢাকায় নয়।
আমাদের চেষ্টা ও ব্যর্থতা
আমরা অবশ্য চেষ্টা করেছি। ২০১১ সালে রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেট স্মৃতিচিহ্ন প্রদর্শনী আয়োজন করেছিলাম। ২০১৩ সালে জাতীয় জাদুঘরে আরেকটি প্রদর্শনী হয়। ২০১৪-২০১৭ এর মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) ড্রিক গ্যালারি ও জাতীয় জাদুঘরে ফেস্টিভাল করে।
এসব প্রদর্শনীতে ছিল দুর্লভ সংগ্রহ: তেন্দুলকর, লারা, সোবার্সের সই করা ব্যাট; ওয়ার্ন, ওয়াসিম আক্রম, কামরুল হাসান আম্ব্রোসের সই করা বল; শহীদ জিওয়েলের ব্যাট; প্রথম একদিনের জয় ও ২০০৮ সালে ভারতের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয়ের টিকিট। তামিম, শাকিব, মুশফিকের জার্সি থেকে এমনকি লিটন দাস ও শান্তোর ম্যাচ সময়ে ব্যবহৃত গিয়ার সবই রয়েছে।
প্রতিক্রিয়া ছিল অবিশ্বাস্য। দর্শকদের চোখে দেখা যায় তাদের নিজেদের ইতিহাস স্পর্শ করার তৃষ্ণা। কিন্তু সাময়িক প্রদর্শনী কখনো ইতিহাস রক্ষা করতে পারে না। প্রতিবার সমাপ্তির সাথে সাথেই এই জাতীয় সম্পদ কার্ডবোর্ড বাক্সে চলে যায়।
পথচলা কীভাবে?
একটি স্থায়ী মিউজিয়াম গড়ে তোলা গবেষণা, প্রতিষ্ঠানীয় ইচ্ছা ও আর্থিক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। শের-এ-বাংলা স্টেডিয়ামে একটি ছোট উইং হিসাবে শুরু করা যেতে পারে। সময়ের সাথে টিকিট, পর্যটন ও অনুদানের মাধ্যমে এটি আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। যা অভাব, তা হলো রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি।
বিসিবি ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ: সময় এখনই। আমাদের আছে ইতিহাস, সংগ্রহ ও আন্তরিক সংরক্ষক। শুধু একটা বাড়ির অভাব।
পিকাসো বলেছিলেন, “আমাকে একটা মিউজিয়াম দাও, আমি তা ভরে দেব।” দীর্ঘ সময় সংগ্রহ ও স্বপ্ন দেখার পর সেই প্রতিশ্রুতি আমি দেই আমাদের কর্তৃপক্ষের কাছে। বাংলাদেশকে একটি ক্রিকেট মিউজিয়াম দিন—আমরা তা ভরিয়ে দেব।
