বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটিং তাণ্ডব: রাজস্থানের ১৫ বছর বয়সী বিস্ময়কে থামানোর রহস্য ফাঁস করলেন হরভজন সিং
রাজস্থান রয়্যালসের নতুন বিস্ময়: ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশী
আইপিএল মানেই প্রতিভার বিচ্ছুরণ, আর ২০২৬-এর এই মরশুমটি ক্রিকেট বিশ্ব মনে রাখবে বৈভব সূর্যবংশীর উত্থানের জন্য। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি যেভাবে বিশ্বের বাঘা বাঘা বোলারদের গ্যালারিতে পাঠাচ্ছেন, তা কেবল অবিশ্বাস্যই নয়, বরং এক নতুন যুগের সূচনা বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। রাজস্থান রয়্যালসের এই তরুণ ব্যাটার রবিবারের ম্যাচেও তার বিধ্বংসী মেজাজ বজায় রেখেছিলেন।
দিল্লি ক্যাপিটালসের বিরুদ্ধে তাণ্ডব ও ম্যাচের চিত্র
রবিবার দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে দিল্লি ক্যাপিটালসের মুখোমুখি হয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস। ম্যাচে রাজস্থান পরাজিত হলেও, বৈভব সূর্যবংশীর ২১ বলে ৪৬ রানের ইনিংসটি ছিল ম্যাচের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। তার এই ইনিংসে ছিল ৫টি চার এবং ৩টি বিশাল ছক্কা। ধ্রুব জুরেলের সাথে তার ৭০ রানের দ্রুতগতি সম্পন্ন পার্টনারশিপ রাজস্থানকে এক শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। অধিনায়ক রিয়ান পরাগ এবং জুরেল দুজনেই অর্ধশতরান করেন, যার ফলে ১৫ ওভার শেষে রাজস্থানের স্কোর ছিল ১৬১/২।
তবে খেলার মোড় ঘুরে যায় ১৫তম ওভারে, যখন অভিজ্ঞ মিচেল স্টার্ক আক্রমণ শানান। স্টার্ক সেই ওভারে পরাগসহ তিন উইকেট নিয়ে রাজস্থানকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেন। শেষ পর্যন্ত রাজস্থান রয়্যালস ৮ উইকেট হারিয়ে ১৯৩ রানে থামে। ১৯৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দিল্লির হয়ে কেএল রাহুল এবং অভিষেক পোড়েল ১০৫ রানের ওপেনিং পার্টনারশিপ করেন। অক্ষর প্যাটেল ঠান্ডা মাথায় ম্যাচটি দিল্লির অনুকূলে নিয়ে যান এবং শেষে আশুতোষ শর্মার ঝোড়ো ইনিংস দিল্লিকে জয় এনে দেয়।
হরভজন সিংয়ের বিশেষ পরামর্শ: কীভাবে থামানো যাবে বৈভবকে?
বৈভবের এমন মারমুখী ব্যাটিং দেখে ভারতের প্রাক্তন স্পিনার হরভজন সিং তার কৌশলগত বিশ্লেষণ শেয়ার করেছেন। হরভজন মনে করেন, বৈভবকে তার ‘হিটিং আর্ক’ বা প্রিয় জায়গা থেকে দূরে বল করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তিনি বলেন, “বৈভব সূর্যবংশীর বিপক্ষে আমার পরিকল্পনা হতো যেকোনো মূল্যে তার উইকেট নেওয়া। সে এখন যে ফর্মে আছে, তা বোলারদের জন্য সত্যিই চিন্তার। আমি তাকে বল স্পিন করিয়ে তার থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতাম।”
হরভজন আরও যোগ করেন যে, বৈভবকে ক্রিজে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে শট খেলতে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, “সে যদি ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে আমাকে মারার চেষ্টা করে, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি চাই না সে ক্রিজে দাঁড়িয়ে নিজের ইচ্ছেমতো শট খেলুক। বোলার হিসেবে এটাই হতো আমার প্রধান পরিকল্পনা।”
ক্রিস গেইলের সাথে তুলনা: ভাজ্জির চোখে বৈভব এক অন্য উচ্চতায়
আলোচনা চলাকালীন হরভজন সিং বৈভবকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ব্যাটার ক্রিস গেইলের সাথে তুলনা করতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বলেন, “আমি আমার ক্যারিয়ারে অনেক বড় বড় ব্যাটারের বিরুদ্ধে খেলেছি। আমি ক্রিস গেইলকে অনেকবার আউট করেছি, কিন্তু এই ১৫ বছরের ছেলেটি যে স্তরে ব্যাটিং করছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সে প্রথম বল থেকেই বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। বৈভবের ব্যাটের ফ্লো এবং শট নির্বাচনের ক্ষমতা আমি এর আগে দেখিনি।”
আইপিএল ২০২৬-এ বৈভবের পরিসংখ্যানগত আধিপত্য
বৈভব সূর্যবংশীর জন্য এই মরশুমটি স্বপ্নের মতো কাটছে। আইপিএলের মতো কঠিন টুর্নামেন্টে অনেক সময় তরুণ খেলোয়াড়রা দ্বিতীয় সিজনে খেই হারিয়ে ফেলেন, কিন্তু বৈভব যেন দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়:
- মোট রান: ১২ ম্যাচে ৪৮৬ রান।
- গড়: ৪০.৫০।
- স্ট্রাইক রেট: ২৩৪.৭৮ (যা এই মরশুমে অন্যতম সেরা)।
- সেরা সাফল্য: ২ টি হাফ-সেঞ্চুরি এবং ১ টি সেঞ্চুরি।
- ছক্কা: ৪৩টি ছক্কা মেরে তিনি বর্তমানে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ছক্কা হাঁকানো খেলোয়াড়।
জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার হাতছানি?
অরেঞ্জ ক্যাপের দৌড়ে ৬ নম্বরে থাকা এই তরুণ প্রতিভা সম্পর্কে মোহিত শর্মার মতো অভিজ্ঞ পেসারও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। মোহিত শর্মা নির্বাচক অজিত আগরকর এবং গৌতম গম্ভীরকে পরামর্শ দিয়েছেন যেন বৈভবকে এখনই উচ্চতর পর্যায়ে পরীক্ষা করে দেখা হয়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যে পরিণত মানসিকতা এবং ক্ষমতার পরিচয় বৈভব দিচ্ছেন, তাতে খুব শীঘ্রই তাকে ভারতীয় নীল জার্সিতে দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। রাজস্থান রয়্যালসের এই রত্ন এখন ভারতীয় ক্রিকেটের আগামী দিনের মহাতারকা হওয়ার পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছেন।
