বৈভব সূর্যবংশীকে কি এখনই জাতীয় দলে নেওয়া উচিত? মোহিত শর্মার জোরালো সওয়াল অজিত আগরকর ও গৌতম গম্ভীরের কাছে
ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন সূর্যোদয়: ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশী
ভারতীয় ক্রিকেটে প্রতিভার অভাব কখনওই ছিল না। তবে মাঝে মাঝে এমন কিছু নক্ষত্রের উদয় হয় যারা বয়সের সীমানাকে হার মানিয়ে দেয়। তেমনই এক বিস্ময়কর নাম বৈভব সূর্যবংশী। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই আইপিএল ২০২৬-এ রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে যেভাবে তিনি বিশ্বমানের বোলারদের শাসন করেছেন, তাতে মুগ্ধ গোটা ক্রিকেট দুনিয়া। তার এই বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের পর থেকেই ক্রিকেট মহলে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— বৈভব কি এখনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত? প্রাক্তন ভারতীয় পেসার মোহিত শর্মা মনে করেন, সময় এসেছে বৈভবকে জাতীয় দলের জার্সিতে পরখ করে দেখার।
মোহিত শর্মার জোরালো আবেদন অজিত আগরকর ও গৌতম গম্ভীরকে
ভারতের অভিজ্ঞ পেসার মোহিত শর্মা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বৈভবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। তিনি মনে করেন, নির্বাচক প্রধান অজিত আগরকর এবং প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরের উচিত এই তরুণ প্রতিভাকে বড় মঞ্চে সুযোগ দেওয়া। মোহিতের মতে, যদি দলে কোনো জায়গা ফাঁকা থাকে, তবে বৈভবকে সেখানে খেলিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ওর ভারতের হয়ে খেলা উচিত। কেন নয়? দেশের হয়ে খেলার জন্য আপনার কী প্রয়োজন? বড় দল এবং বড় ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে পারফর্ম করা প্রয়োজন, যা ও ইতিমধ্যেই আইপিএলে করে দেখাচ্ছে। এখন সবকিছু নির্ভর করছে দলের কম্বিনেশন এবং টিম ম্যানেজমেন্টের চিন্তাভাবনার ওপর। ও প্রস্তুত কি না সেই প্রশ্নে আমি বলব, সুযোগ থাকলে ওকে অবশ্যই পরখ করা উচিত।’
আইপিএল ২০২৬-এ বৈভবের অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান
বৈভব সূর্যবংশী আইপিএল ২০২৫-এ মাত্র ১৪ বছর বয়সে অভিষেক ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬-এর মরসুমটি ছিল তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এই টুর্নামেন্টে তিনি যে আগ্রাসী ক্রিকেট খেলেছেন, তা আইপিএলের ইতিহাসে বিরল। তার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যায় কেন তাকে নিয়ে এত উন্মাদনা:
- ম্যাচ: ১২
- রান: ৪৮৬
- গড়: ৪০.৫০
- স্ট্রাইক রেট: ২৩৪.৭৮
- সেঞ্চুরি: ১
- হাফ-সেঞ্চুরি: ২
আইপিএল ২০২৬-এর অরেঞ্জ ক্যাপের তালিকায় বর্তমানে তিনি ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন। ২৩৪-এর ওপর স্ট্রাইক রেট বজায় রেখে প্রায় ৫০০ রান করা একজন ১৫ বছরের কিশোরের পক্ষে অবিশ্বাস্য এক কীর্তি।
ইন্ডিয়া-এ দলের শ্রীলঙ্কা সফর ও বৈভবের অন্তর্ভুক্তি
জাতীয় দলের মূল স্কোয়াডে ডাক পাওয়ার আগেই বৈভবকে বড় সুযোগ দেওয়া হয়েছে ইন্ডিয়া-এ দলে। আগামী জুন মাসে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য একটি ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য তিনি ডাক পেয়েছেন। ৫০ ওভারের এই লিস্ট-এ সিরিজে ভারত ছাড়াও খেলবে শ্রীলঙ্কা-এ এবং আফগানিস্তান-এ দল। এই দলের নেতৃত্ব দেবেন তিলক ভার্মা এবং সহ-অধিনায়ক হিসেবে থাকবেন রিয়ান পরাগ। সিরিজটি ৯ জুন থেকে ২১ জুন পর্যন্ত চলবে। ডাবল রাউন্ড-রবিন ফরম্যাটের এই টুর্নামেন্টে বৈভবের পারফরম্যান্সের ওপর নজর থাকবে নির্বাচকদের। এছাড়া শ্রীলঙ্কা-এ দলের বিপক্ষে দুটি চার দিনের বেসরকারি টেস্ট ম্যাচ খেলারও কথা রয়েছে ইন্ডিয়া-এ দলের, তবে সেখানে বৈভব খেলবেন কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ওপেনিং পজিশনের লড়াই: বৈভবের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে ভারতীয় টি-টোয়েন্টি দলে ওপেনিং পজিশনের জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। অভিষেক শর্মা এবং সঞ্জু স্যামসন বর্তমানে ওপেনার হিসেবে খেলছেন। এছাড়া ইশান কিষাণ, যশস্বী জয়সওয়াল এবং শুভমান গিলের মতো প্রতিষ্ঠিত তারকারাও নিজেদের সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে বৈভব কীভাবে নিজের জায়গা করে নেন, সেটাই দেখার বিষয়। মোহিত শর্মা এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘অভিষেক শর্মার মতো ক্রিকেটাররাও খুব আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলছে। আগে ব্যাটিং মানেই ছিল শুধু পাওয়ার হিটিং, কিন্তু এখন টেকনিক এবং টাইমিংয়ের ওপর অনেক জোর দেওয়া হয়। অভিষেক বা ইশান কিষাণের মতো তরুণরা বর্তমান প্রজন্মের ব্যাটিংয়ের ধরন বদলে দিচ্ছে।’
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং মোহিত শর্মার মজার মন্তব্য
বৈভবের বয়স মাত্র ১৫ বছর হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনি যদি সঠিক পথে চলেন তবে আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর ভারতীয় ক্রিকেটকে সেবা দিতে পারবেন। মোহিত শর্মা রসিকতা করে বলেন যে, তিনি খুশি যে তিনি এখন আর খেলছেন না। কারণ বৈভব যেভাবে ফাস্ট বোলারদের আক্রমণ করেন, তাতে বোলারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক। মোহিত বলেন, ‘ও শুধু ব্যাটিং করছে না, বড় বড় বোলারদের শাসন করছে। সময়ের সাথে সাথে ও আরও শিখবে এবং নিজেকে উন্নত করবে। বর্তমানে ও একটি নির্দিষ্ট শৈলী এবং ফরম্যাটে খেলছে। ওর যে প্রতিভা আছে, তাতে আমি নিশ্চিত ও অনেক দূর যাবে। আমি খুশি যে আমি অবসর নিয়েছি, নয়তো আমাকেও ওর মার খেতে হতো।’
বৈভব সূর্যবংশীর উত্থান ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য এক শুভ সংকেত। আগ্রাসন এবং টেকনিকের এক দুর্লভ সংমিশ্রণ দেখা যাচ্ছে এই কিশোরের ব্যাটে। অজিত আগরকর এবং গৌতম গম্ভীর যদি মোহিত শর্মার পরামর্শ মেনে তাকে দ্রুত জাতীয় দলে সুযোগ দেন, তবে হয়তো ভারত বিশ্ব ক্রিকেটে আরও এক নতুন মহাতারকাকে পেতে চলেছে। এখন শ্রীলঙ্কা সফরে ইন্ডিয়া-এ দলের হয়ে তার পারফরম্যান্সই ঠিক করে দেবে পরবর্তী গন্তব্য।
